উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণে একটি সাশ্রয়ী ও টেকসই গবেষণা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) একদল গবেষক। এ পদ্ধতিতে অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই কম খরচে উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং প্লাস্টিক দূষণ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
‘সিটিজেন ফর কোস্টাল ইকোসিস্টেম মনিটরিং (সিফোরসিইএম)’ নামের এ পদ্ধতিটি সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুব্রত সরকারের নেতৃত্বে ও ‘এনএফ-পোগো অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক ফর দ্য ওশানের (ন্যানো) সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে।
পুরো প্রক্রিয়াটি চালিত হয় ‘ন্যানো-ডোপ সিফোরসিইএম’ নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমে। অ্যাপের উদ্ভাবক গবেষণা দলের সদস্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী কাজী মঈনুল ইসলাম।
এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, গাণিতিক মডেল, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, সাশ্রয়ী যন্ত্র এবং সিটিজেন সায়েন্সের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। ফলে কম খরচে উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং প্লাস্টিক দূষণ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। অ্যাপের মাধ্যমে জিও-রেফারেন্সড ছবি পাওয়ায় প্রাপ্ত তথ্যের আলাদা সত্যতা যাচাইয়েরও প্রয়োজন পড়ে না।
গবেষক দল জানান, এ পদ্ধতি ব্যবহার করতে প্রথমে গুগল প্লে স্টোর থেকে ‘ন্যানো-ডোওপ সিফোরসিইএম’ অ্যাপটি ডাউনলোড করতে হবে। ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করলেই বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই অ্যাপটি চালানো যাবে। অ্যাপে রয়েছে মাছ, প্লাঙ্কটন এবং যে কোনো জীববৈচিত্র্য সংগ্রহের তিনটি আলাদা অপশন। ব্যবহারকারী নির্ধারিত অপশন বেছে ছবি তুললেই অ্যাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবির অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ সংগ্রহ করে মোবাইলে সংরক্ষণ করে রাখে।
মোবাইলে ইন্টারনেট থাকলে তথ্য সঙ্গে সঙ্গে নির্ধারিত ডাটাবেসে চলে যায়। ইন্টারনেট না থাকলেও ছবি ও তথ্য মোবাইলে থেকে যায় এবং পরে ইন্টারনেট চালু হলেই ডাটাবেসে আপলোড হয়। পানির নমুনা থেকে প্লাঙ্কটনের ছবি তোলার জন্য ব্যবহার করা হয় সাশ্রয়ী ও বহনযোগ্য ‘ফোল্ডস্কোপ’ একধরনের পেপার মাইক্রোস্কোপ। ডাটাবেসে সংরক্ষিত ছবি ও তথ্য পরবর্তীতে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত হয়। এখানে শুধু জীববৈচিত্র্যের ছবি ও ভৌগোলিক অবস্থান নয়, মাছের নাম, দৈর্ঘ্য, সংখ্যা, ওজন এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক সম্পদের তথ্যও সংগ্রহ করে পাঠানো যায়।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল থেকে দেড়শ জনেরও বেশি সিটিজেন সায়েন্টিস্ট এ অ্যাপ ব্যবহার করে তথ্য পাঠাচ্ছেন। ২০২২ ও ২০২৩ সালে দুই বছরে অ্যাপের মাধ্যমে সংগৃহীত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ছবি-সম্বলিত তথ্য। এসব ছবি বিশ্লেষণ করে উপকূলীয় ৫০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত এলাকায় জুপ্লাঙ্কটন, সামুদ্রিক শৈবাল, সল্টমার্শ, সামুদ্রিক কাঁকড়াসহ চার শতাধিক সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে।
ছবিগুলো স্থানিক তথ্য-সম্বলিত হওয়ায় প্রজাতিগুলোর আবাসস্থল সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। পদ্ধতির মাধ্যমে সেন্টমার্টিন দ্বীপের চারপাশকে প্রবাল, সি-কিউকাম্বার ও সামুদ্রিক শৈবালের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলেদের মাছ ধরার স্থান সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে এ পদ্ধতির মাধ্যমে।
অ্যাপটির সুবিধা প্রসঙ্গে গবেষক দলের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. সুব্রত সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা যেসব পদ্ধতিতে ডাটা সংগ্রহ করে থাকি, তার মধ্যে এটি সবচেয়ে সাশ্রয়ী। নিজেরা নৌকা নিয়ে ডাটা সংগ্রহে গেলে প্রতিবারে ৮০-৯০ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু এ পদ্ধতিতে জেলেদের নৌকায় শুধু ডিভাইস ইনস্টল করে দিলেই হয়। তারা যেখানে যান, নিজেদের কক্ষে বসেই আমরা সব দেখতে পাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘গভীর সমুদ্রে গেলে জেলেদের ইন্টারনেট থাকে না। তখন তাদের পরিবার বা মালিকরা আমাদের জানিয়ে দেন নৌকাগুলো কোথায় আছে। বৈরী আবহাওয়ার পূর্বাভাসও তারা আমাদের কাছ থেকে নিয়ে নিতে পারেন। ফলে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কখন নৌকা পাঠানো যাবে না। তারা পূর্বপ্রস্তুতিও নিতে পারেন। জেলেরা গভীর সমুদ্রে গেলেও আমাদের বাড়তি খরচ হয় না।’
আজকের সিলেট/ডি/এপি
নিউজ ডেস্ক 








