কৃষকের ধান সংগ্রহ সিন্ডিকেটের পকেটে, সরকারি গুদামে চলছে কার্ড বাণিজ্য
সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ১০:৩৫ PM

কৃষকের ধান সংগ্রহ সিন্ডিকেটের পকেটে, সরকারি গুদামে চলছে কার্ড বাণিজ্য

দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৮/০৬/২০২৬ ০৮:৪২:০১ PM

কৃষকের ধান সংগ্রহ সিন্ডিকেটের পকেটে, সরকারি গুদামে চলছে কার্ড বাণিজ্য


সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে কৃষকদের পরিবর্তে একটি চক্র সরকারি গুদামের ধান বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকেরা।

উপজেলা খাদ্য অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে উপজেলা খাদ্য গুদামের জন্য ২ হাজার ৮৮৫ মেট্রিক টন বোরো ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, গত ৪ মে দিরাই শাল্লার সংসদ সদস্য নাছির চৌধুরী উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। 

বাজারদরের তুলনায় এ মূল্য বেশি হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে সরকারি গুদামে ধান বিক্রির ব্যাপক আগ্রহ ছিল।

কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব খাদ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টতায় এবং অর্থবিত্তের জোরে গড়ে উঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে বরাবরের মতোই হেরে যান কৃষক। বাধ্য হয়ে তারা কিছু টাকার বিনিময়ে বিক্রি করছেন কৃষি কার্ড। ফলে সরকার নির্ধারিত মুল্যে ধান বিক্রির সুযোগ না পেয়ে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় ধান ব্যবসায়ী ও সরকারি দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন মিলে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তাঁরা কৃষকদের কাছ থেকে কৃষি কার্ড জোগাড় করেছেন এবং কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মণ ধান ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা দরে কিনে সরকারি খাদ্যগুদামে ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।

উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে দিরাইয়ে ৩০ হাজার ১৭৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাধ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৭ মেট্রিক টন। অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে ৩ হাজার ১০৫  হেক্টর জমির ফসল নষ্ট  হয়। 

সরেজমিনে উপজেলা খাদ্য গুদামে গিয়ে দেখা যায়, গুদামের ভেতরে ও আশপাশে বিপুল পরিমাণ ধান বস্তাবন্দি অবস্তায় রাখা। গুদামে কর্মচারী ও লেবাররা ধান সংগ্রহ কাজে ব্যস্ত পুরো গুদাম এলাকা ঘুরে ও কোন কৃষকের খোঁজ পাওয়া যায়নি। কৃষক কোথায় জানতে চাইলে গুদামের কর্মচারী জানান কৃষক বাজারে গেছে আসতেছেন, দির্ঘ অপেক্ষার পড়ও আসেননি কৃষক।

উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের কৃষক মুক্তার, জগদল ইউনিয়নের জগদল গ্রামের হেলাল আহমেদ, তাড়ল ইউনিয়নের ভাটিধল গ্রামের মামুন মিয়া, কুলঞ্জ ইউনিয়নের তাহির আলি রাজানগর ইউনিয়নের জামাল মিয়াসহ অনেক কৃষক বলেন, আমারা ধান সংগ্রহের কোনো মাইকিং শুনিনি। ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান কিনবে সরকার এ খবর খাদ্য অফিসের মাধ্যমে জেনেছে শুধু মধ্যস্বত্বভোগীরা। এ জন্য গোপনে কৃষকের কাছথেকে কার্ড সংগ্রহ করে এক শ্রেণির দালাল চক্র।

এদিকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত তালিকার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তাদের নাম ও ঠিকানা তালিকার সঙ্গে বাস্তবের কোনো নেই।

দিরাই পৌরসভার দাউদপুর গ্রামের আক্কাস মিয়া-এনআইডি-৯০২২৯০৪৮৯০৩৫৬ এর ফোন রিসিভ করেন দিরাই ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক মজলিশপুর গ্রামের শরিফ রব্বানী। তিনি বলেন আক্কাস মিয়া কে আমি জানিনা।

জগদল ইউনিয়নের মাতারগাও গ্রামের আব্দুল মুকিত-এনআইডি-৯০১২৯৩৮৯১৮৫০৫০এর ফোন নম্বর রিসিভ করে আকাশ মিয়া জানান আব্দুল মুকিত আমার চাচাতো ভাই তিনি আমার পশে নেই।

ওই গ্রামের দিলারা বেগম এন আইডি নম্বর-৯০১২৯৩৮৯১৮৯১৭ তাকে ফোন পুত্রবধূর ফাহমিদা বেগম জানান, আমাদের ধান নেই, খাদ্য গুদামে ধান দিয়েছেন পৌরসভার ঘাগটিয়া গ্রামের আব্দুল আউয়াল। এছাড়াও খাদ্য গুদামে ধান ক্রয় তালিকায় একই পরিবারের ৩ জনের নাম রয়েছে। তারা হলেন, করিমপুর ইউনিয়নের টুকদিরাই গ্রামের জগৎ দাস, পিতা :বৈদ্যনাথ দাস এনআইডি-৯০১২৯৪৭৯১৮৮৪৬ ও কমা দাস, স্বামী : জগৎ দাস এনআইডি-৯০১২৯৪৭৯৩৪২৭ ও পার্থ দাস, পিতা: জগৎ দাস এনআইডি- ৮৭২২২৮৮৬৯৬।

উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের জটিচর গ্রামের বাসিন্দা কাইমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বন মজুমদারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি ধান দেই নাই,তবে মাধ্যম ছিলাম ধান দিছেন গুলজার সাহেব। আমি কাইমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। খাদ্য গুদামে ধান দেওয়ার সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না,শুধু টাকা তুলার দিন যাই। জকিনগর গ্রামের রওশল আলী জানান, আমি গুদামে ধান বিক্রি করি নাই, আমার কার্ড ব্যবহার করে গুদামে ধান বিক্রি করছে আমার ভাতিজা চাঁন খাঁ। আমি শুধু টাকা উত্তোলনের দিন গেছি।

কৃষক ছাড়াই ধান সরবরাহের বিষয়ে জানতে চাইলে  দিরাই খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা (এলএসডি) শফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে কোন কথা বলতে পারবেন না বলে জানান।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজিব সরকার বলেন, কৃষক নিজেই যদি ধান বিক্রি করতে অন্যজনকে সহায়তা করে তাতে আমাদের কিছুই করার নাই। লটারির মাধ্যমে কৃষকের তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে,এক পরিবারের তিন জনের নাম লটারিতে থাকতেই পারে বলে জানান তিনি।

আজকের সিলেট/এপি/প্রতিনিধি

সিলেটজুড়ে


মহানগর