সিলেটে বন্যার পদধ্বনি
বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ০২:১৯ PM

♦ প্রস্তুত ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র ♦ ঝুঁকিপূর্ণ ১৬০টি টিলা নিয়ে শঙ্কা

সিলেটে বন্যার পদধ্বনি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯/০৭/২০২৬ ১০:৫৯:৫৮ AM

সিলেটে বন্যার পদধ্বনি


টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট অঞ্চলের সবকয়টি নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে হবিগঞ্জে কুশিয়ারা ও খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়ালেও সুরমাসহ অন্য নদ-নদীর পানি বুধবার রাত ১১ টা পর্যন্ত বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকালে এ অঞ্চলের নদ-নদীর পানি যেকোনো মুহূর্তে ছাড়াতে পারে এবং বিভাগের চার জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আগামী ৪৮ ঘণ্টা সিলেট বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ খোন্দকার হাফিজুর রহমান।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেট অফিস সূত্র জানায়, বুধবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জেলার ১১টি নদীর সবকয়টির পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে ৭৪ সেন্টিমিটার, সিলেট পয়েন্টে ২৯ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর পানি আমলশীদ, শেওলা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও শেরপুর পয়েন্টে যথাক্রমে ১১, ১৪, ১৫ ও ৩৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।

সারিগোয়াইন নদীর পানি সারিঘাটে ৪২ সেন্টিমিটার ও গোয়াইনঘাটে ২০ সেন্টিমিটার, পিয়াইন নদীর পানি জাফলংয়ে ২৬ সেন্টিমিটার, লোভাছড়ার পানি লোভাছড়া পয়েন্টে ৮২ সেন্টিমিটার এবং ধলাই নদীর পানি ইসলামপুরে ৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাউবো সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস জানিয়েছেন, আগামী দুইদিন সিলেট অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ভারতের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে ঢল নামা অব্যাহত থাকলে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সব উপজেলায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র। পাশাপাশি জেলার ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা চিহ্নিত করে সেসব এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ টিলা ও পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী জানিয়েছেন, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিটি করপোরেশন প্রস্তুত রয়েছে। বৃষ্টির মধ্যেও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা মাঠে কাজ করছেন। ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখতে নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে। নিচু এলাকায় পানি উঠলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্র ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা বলেন, জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ টিলা এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক করতে মাইকিং চলছে। প্রয়োজন হলে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, জেলায় ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা চিহ্নিত করা হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। পাশাপাশি সব উপজেলায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে এবং মাঠ প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।’

এদিকে, মৌলভীবাজার জেলায় টানা বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে জেলার মনু, ধলাই, কুশিয়ারা ও জুড়ি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও কমলগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি স্থানে ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যে কোনো সময় বাঁধ ভেঙে বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

এছাড়া হবিগঞ্জ জেলার সবকয়টি নদ-নদীর পানি হু-হু করে বাড়ছে। সময়ের সাথে সাথে ফুঁসছে নদীগুলো। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী আরও কয়েকদিন ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড। এদিকে- নদ-নদীগুলোতে পানি ক্রমাগত বাড়লেও বুধবার বিকেল পর্যন্ত বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্ক বাড়ছে নদী পাড়ের মানুষদের মধ্যে।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, উজানে ও দেশের অভ্যান্তরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। তবে এখনও বিপৎসীমা অতিক্রম হয়নি। তবে খোয়াই নদীর বাল্লা পয়েন্টে পানি দ্রুত বাড়ছে। এছাড়া কুশিয়ারা, সুতাং ও সোনাইসহ সককটি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

হবিগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, ‘এখনও আমরা বন্যার কোনো পূর্বাভাস পাইনি। পূর্বাভাস পেলে যদি বন্যা হয়, তা হলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে।’

এ ছাড়া সুনামগঞ্জ জেলার সবগুলো নদ-নদীর পানি বাড়লেও এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। সুরমা নদীর পানি ষোলঘর পয়েন্টে বিপৎসীমার ১১১ সেন্টিমিটার ও ছাতকে ৯৭ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। শক্তিয়ারখলা পয়েন্টে যাদুকাটা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৪৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গেল ২৪ ঘণ্টায় ওই নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৮ সেন্টিমিটার।

এদিকে বুধবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে সিলেটসহ দেশের চার বিভাগের কয়েকটি নদীর পানি আগামী তিন দিনে বাড়তে পারে। এতে ওই সব বিভাগে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে প্রায় তিন দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হচ্ছে। কিছু কিছু স্থানে বৃষ্টির পরিমাণ ২৪ ঘণ্টায় ২০০ মিলিমিটার ছাড়িয়ে গেছে।

এ বৃষ্টিপাত চলতে পারে শনিবার পর্যন্ত। এর প্রভাবে ইতোমধ্যে সিলেট বিভাগের কয়েকটি নদীর পানি বেড়ে গেছে। বৃষ্টিতে কিছু নদীর পানি আরও বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে এসব বিভাগে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

একই সঙ্গে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের নদীসমূহের কিছু কিছু স্থানে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, যে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, তা তিন দিন থাকতে পারে। এর পর থেকে, অর্থাৎ শনিবার থেকে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর