ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন শত শত টন আমদানি পণ্য আসছে। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, আধুনিক গুদাম ব্যবস্থার অভাব এবং বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে একই গতিতে খালাস করতে না পারায় তৈরি হচ্ছে বড় কার্গো জট। বর্তমানে প্রায় দেড় হাজার টন পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এই কার্গো জটের প্রভাব আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তার ওপরও পড়ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, নানা অব্যবস্থাপনার কারণে কার্গো খালাস করতে কয়েক দিন লেগে যাচ্ছে। এই বিলম্বে তাদের কোটি কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে। অথচ আধুনিক ব্যবস্থাপনা চালু হলে এই সংকটের বড় অংশই দূর করা সম্ভব।
জানা যায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্গো উইংয়ের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকিতে কার্গোতে আনা আমদানি পণ্য খালাস করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় অপারেশনাল হ্যান্ডলিং হয় বিমান বাংলাদেশ ও অনুমোদিত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এজেন্সির মাধ্যমে।
আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের অভিযোগ, বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো এলাকায় ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পণ্য রাখায় তীব্র অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে। ১০ টনের জায়গায় ১৪২ টন পণ্য গাদাগাদি করে রাখার ফলে সব কাগজপত্র প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট প্লেট বা কার্গোর অবস্থান খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেক সময় খোলা আকাশের নিচে খোলা অবস্থায় পণ্য ফেলে রাখায় বৃষ্টিতে ভিজে মূল্যবান মালামাল নষ্ট হচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারা আরও অভিযোগ করেন, কার্গো খালাসের জন্য নিয়মিত হ্যান্ডলিং ও অটোমেশন চার্জ দেওয়া হলেও সেবার মান অত্যন্ত নাজুক। ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার অভাবে রাতের বেলা মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে পণ্য খুঁজতে হয়। এর পাশাপাশি একটি কনটেইনার বা ইউএলডি খুলে মাল বের করা এবং বিভিন্ন ধাপে পণ্য ডেলিভারি নেওয়ার ক্ষেত্রে অঘোষিত অর্থ লেনদেন হয়। এই হয়রানি ও সমন্বিত পরিবহন সেবার সংকটে ব্যবসায়ীদের অযথা সময় ও অর্থের অপচয় ঘটছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানের একটি আধুনিক এয়ার কার্গো কমপ্লেক্স পরিচালনার জন্য তিন শিফটে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল প্রয়োজন। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি নিশ্চিত করা গেলে কার্গো জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে এবং আমদানিকারকরা দ্রুত পণ্য ছাড় পেতে পারবেন। তাছাড়া কার্গো ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ওয়্যারহাউস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ডব্লিউএমএস) চালু করা গেলে পণ্য খুঁজে বের করা, সংরক্ষণ ও ডেলিভারি অনেক দ্রুত হবে। এতে বারকোড বা আরএফআইডি প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজেই পণ্য ট্র্যাক করা সম্ভব হবে এবং অনলাইন ডেলিভারি ব্যবস্থাপনা চালু হলে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে।
সরেজমিনে যা দেখা গেল
গত ৭ জুন বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশের পণ্যবাহী কার্গো কনটেইনার ও প্যালেট সারিবদ্ধভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। অনেক আমদানিকারক ও ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট কাগজপত্র সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। কোথাও কুরিয়ার পণ্যের বাছাই চলছে, আবার কোথাও কাস্টমসের অনুমোদনের অপেক্ষায় দিনের পর দিন পণ্য পড়ে আছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জায়গার তুলনায় পণ্যের চাপ অনেক বেশি হওয়ায় খুঁজে বের করা, যাচাই-বাছাই ও খালাসে সময় লেগে যাচ্ছে।
প্রতিদিন ৪৫ থেকে ৫০টি ফ্লাইট, কিন্তু চার্টার কার্গোতেই বড় জট
ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, প্রতিদিন গড়ে ৪৫ থেকে ৫০টি ফ্লাইট ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এর মধ্যে ৫ থেকে ৮টি চার্টার কার্গো ফ্লাইট ও প্রায় ৪৫টি নিয়মিত ফ্লাইট। নিয়মিত ফ্লাইটের পণ্য সাধারণত বিমান অবতরণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যাচাই-বাছাই শেষে নোটিশ অব অ্যারাইভাল দেওয়া হয়। আর চার্টার্ড কার্গোর ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়ায় ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগে।
কিন্তু প্রতিদিন নিয়মিত ফ্লাইটে ৩৫০ থেকে ৪০০ টন কার্গো আসতে থাকায় কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টন পণ্য শুধু নোটিশ অব অ্যারাইভালের অপেক্ষায় বিমানবন্দরে জমা হয়ে থাকে।
এদিকে, কার্গো বিমান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গ্রহণ করার পর সংশ্লিষ্ট কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্য বাছাই (সর্টিং) এবং প্রকৃত আমদানিকারকের কাছে পৌঁছে দিতে আরও ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগে। ফলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্ব দেখা দেয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ৮০ শতাংশ চালান দ্রুত ছাড় হলেও ২০ শতাংশ আটকে যায়। আমদানিকারকের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার পর কাস্টমসে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হলে প্রায় ৮০ শতাংশ চালান ৩ থেকে ৪ দিন দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর পরিশোধের কারণে এক থেকে দুই দিন অতিরিক্ত সময় লাগে। সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দেয় বাকি ২০ শতাংশ চালানের ক্ষেত্রে, যেগুলো বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদন ছাড়া কাস্টমস থেকে ছাড় করা যায় না।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি মো. খাইরুল আলম ভুঁইয়া মিঠু বলেন, বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে চলা অব্যবস্থাপনার কোনো কার্যকর সমাধান এখনো হয়নি। বরং দিনে দিনে আমদানিকারকরা আরও বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। খোলা আকাশের নিচে পণ্য রাখার কারণে বৃষ্টিতে অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে যায়, যা ব্যবসায়ীদের বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
তিনি বলেন, কার্গো জটের জন্য সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের দায়ী করা হলেও বাস্তবে এটি পুরো ব্যবস্থাপনার সংকট।
খাইরুল আলমের অভিযোগ, একটি ইউএলডি (কন্টেইনার) খুলে মাল বের করতে অনিয়মিত অর্থ লেনদেনের প্রয়োজন হয়। পণ্য ডেলিভারির জন্য সিঅ্যান্ডএফ কর্মীদের বারবার বিভিন্ন অফিসে যেতে হয়, অথচ পর্যাপ্ত পরিবহন বা সমন্বিত সেবা নেই।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় ফ্লাইটে আসা পণ্যের নির্দিষ্ট অবস্থানও খুঁজে পাওয়া যায় না। সব কাগজপত্র প্রস্তুত থাকলেও শুধু একটি প্লেট নম্বর দিয়ে মাল খুঁজে নিতে বলা হয়। ফলে আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ব্যবসায়ীরা অযথা সময় ও অর্থ ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
শেখ জাহিদ নামে একজন ব্যবসায়ী জানান, কার্গো খালাসের জন্য আমদানিকারকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের হ্যান্ডলিং ও অটোমেশন চার্জ নেওয়া হলেও সেবার মানে তার প্রতিফলন নেই।
তিনি বলেন, পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে নানা ধাপে অঘোষিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আধুনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। ফলে রাতের বেলায় মোবাইলের আলো ব্যবহার করে পণ্য খুঁজতে হয়।
এই ব্যবসায়ী দাবি করেন, প্রকৃত সমস্যাগুলো তুলে ধরলে উল্টো হয়রানির মুখে পড়তে হয়। কার্গো ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আধুনিকায়ন না হলে আমদানিকারক এবং ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
১৯টি সংস্থার অনুমোদনের কারণে বাড়ছে কার্গো জট
কার্গো খালাসের একটি অংশ কাস্টমসের প্রক্রিয়া শেষ হলেও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদনের অপেক্ষায় আটকে থাকে আমদানি করা নানা পণ্য। এসব পণ্যের জন্য বিএসটিআইর পরীক্ষার সনদ, রেডিয়েশন টেস্ট রিপোর্ট, বিটিআরসির অনুমোদন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, কেমিক্যাল টেস্ট রিপোর্ট, বুয়েটের পরীক্ষার সনদসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৯টি সংস্থা বিভিন্ন ধরনের পণ্যের জন্য এসব অনুমোদন দিয়ে থাকে। ফলে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পেতে সময় লাগায় প্রতিদিন গড়ে অতিরিক্ত আরও প্রায় ১০০ টন কার্গো বিমানবন্দরে জমে থাকে, যা সামগ্রিক কার্গো জট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ সমস্যা কাস্টমসের মূল প্রক্রিয়ায় নয়; বরং নোটিশ অব অ্যারাইভাল, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং আধুনিক ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার অভাবে সৃষ্টি হচ্ছে। যদি রপ্তানিকারক দেশের কর্তৃপক্ষের দেওয়া সার্টিফিকেট ও টেস্ট রিপোর্ট এলসির বাধ্যতামূলক অংশ করা হয় এবং কাস্টমস সেগুলো গ্রহণ করে, তাহলে জট অনেকটাই কমে আসবে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টন কার্গো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের কার্গো ভিলেজ, ডিজিটাল ওয়্যারহাউস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং প্রশিক্ষিত জনবল এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি সময়ের দাবি।
ইলেকট্রনিক্স আমদানিকারক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বলেন, আমাদের পণ্য কয়েক দিন বিমানবন্দরে আটকে থাকলে শুধু গুদাম ভাড়া নয়, ব্যাংক সুদ, পরিবহন ব্যয় এবং ব্যবসায়িক ক্ষতি বেড়ে যায়। সময়মতো বাজারে পণ্য দিতে না পারলে ক্রেতাও হারাতে হয়।
মেডিকেল সরঞ্জাম ব্যবসায়ী শাহীন আহমেদ জানান, অনেক সময় একটি অনুমোদনের জন্য কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হয়। অথচ হাসপাতালে বা বাজারে সেই পণ্যের জরুরি প্রয়োজন থাকে। অনুমোদন প্রক্রিয়া যদি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা যায়, তাহলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ উভয়েই উপকৃত হবে।
কেমিক্যাল আমদানিকারক নাজমুল ইসলাম বলেন, একটি চালান ছাড় করাতে কখনো কখনো একাধিক সংস্থায় যেতে হয়। প্রতিটি ধাপে সময় বাড়ে। এতে ব্যবসার খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি মূল্য ভোক্তাকেই দিতে হয়।
আধুনিক ওয়্যারহাউস ও যন্ত্রপাতির অভাবে বাড়ছে কার্গো জট
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে আধুনিক ওয়্যারহাউস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ডব্লিউএমএস) ব্যবহার করে কার্গো সংরক্ষণ, ট্র্যাকিং ও ডেলিভারি পরিচালনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতিতে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে পণ্য খুঁজে বের করা, যাচাই-বাছাই এবং দ্রুত ডেলিভারিতে সময় বেশি লাগছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টন কার্গো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য বড় আকারের আমদানি কার্গো গুদাম, কাস্টমস পরীক্ষার জন্য আলাদা শেড, পর্যাপ্ত ডেলিভারি এলাকা, মূল্যবান ও ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য সংরক্ষণের পৃথক ব্যবস্থা, কোল্ড স্টোরেজ, ট্রাক পার্কিং সুবিধা এবং পর্যাপ্ত লোডিং-ডেলিভারি ডকের প্রয়োজন। একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা চালু একটি আধুনিক ফায়ার স্টেশনও জরুরি।
এছাড়া কার্গো দ্রুত ওঠানামা ও স্থানান্তরের জন্য মেইন ডেক ও লোয়ার ডেক লোডার, বিভিন্ন ক্ষমতার ফর্কলিফট, টো ট্র্যাক্টর, প্যালেট ডলি, কার্গো ট্রলি, হ্যান্ড প্যালেট ট্রাক এবং কনভেয়ার বেল্ট লোডারের মতো আধুনিক যন্ত্রপাতি দরকার।
নিরাপত্তা ও দ্রুত ব্যবস্থাপনার জন্য বড় আকারের কার্গো এক্স-রে স্ক্যানার, প্যালেট স্ক্যানার, ওয়াক-থ্রু মেটাল ডিটেক্টর, ৩০০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা এবং আধুনিক অ্যাক্সেস কন্ট্রোল সিস্টেম স্থাপনেরও প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা জরুরি
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্গো ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ওয়্যারহাউস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ডব্লিউএমএস) চালু করা গেলে পণ্য খুঁজে বের করা, সংরক্ষণ ও ডেলিভারি অনেক দ্রুত হবে। এতে প্রতিটি কার্গোর অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে জানা যাবে এবং বারকোড বা আরএফআইডি প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজেই পণ্য ট্র্যাক করা সম্ভব হবে।
এছাড়া অনলাইন ডেলিভারি ব্যবস্থাপনা চালু হলে ব্যবসায়ীদের বারবার কার্গো এলাকায় যেতে হবে না। কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি হবে এবং মোবাইল হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইস ব্যবহার করে মাঠপর্যায়েই দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা যাবে।
প্রয়োজন দক্ষ জনবলও
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক মানের একটি আধুনিক এয়ার কার্গো কমপ্লেক্স পরিচালনার জন্য তিন শিফটে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন দক্ষ জনবল প্রয়োজন। এর মধ্যে অপারেশনস ম্যানেজার, ওয়্যারহাউস সুপারভাইজার, কাস্টমস সমন্বয় কর্মকর্তা, ফর্কলিফট অপারেটর, কার্গো হ্যান্ডলার, নিরাপত্তাকর্মী, ফায়ার অ্যান্ড সেফটি কর্মী এবং আইটি সাপোর্ট টিম থাকতে হবে।
তিনি বলেন, অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষ জনবল ও ডিজিটাল প্রযুক্তি নিশ্চিত করা গেলে কার্গো জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে এবং আমদানিকারকরা দ্রুত পণ্য ছাড় পেতে পারবেন।
এই অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ বলেন, বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা হলো, একই প্রতিষ্ঠান সিভিল এভিয়েশন একদিকে নিয়ন্ত্রক, অন্যদিকে বিমানবন্দর পরিচালনাকারী হিসেবেও কাজ করছে। এতে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না। বিশ্বের অনেক দেশে বিমানবন্দর পরিচালনার জন্য পৃথক এয়ারপোর্ট অথরিটি থাকে, আর সিভিল এভিয়েশন কেবল নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জন্যও পৃথক এয়ারপোর্ট অথরিটি গঠন করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। একইসঙ্গে কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না। যে সংস্থা নির্দেশনা দিচ্ছে, বাস্তবায়নের দায়িত্বও যদি তাদেরই থাকে, তাহলে স্বাধীনভাবে তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বেবিচক যা বলছে
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) দাবি, আমদানি-রপ্তানি কার্গো ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই।
বেবিচকের মেম্বার (অপারেশন অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ খান বলেন, আমদানি বা রপ্তানি কার্গো ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বেবিচকের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। এ বিষয়ে অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। বেবিচকের মূল দায়িত্ব হলো বিমানবন্দরের অবকাঠামো বা স্থাপনা প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, বিদেশ থেকে কোনো কার্গো বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সেটি বিমান থেকে নামানো, কার্গো টার্মিনালে নেওয়া এবং পরবর্তী হ্যান্ডলিংয়ের কাজ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এরপর কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পণ্য খালাস করে। অর্থাৎ পুরো কার্গো ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় বিমান, কাস্টমস ও সিএন্ডএফ এজেন্টের ভূমিকা রয়েছে, বেবিচকের নয়।
সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগুন লাগার কারণ নির্ধারণে তদন্ত চলছে এবং এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনই চূড়ান্ত তথ্য দেবে। তবে আগুন লাগার পর তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার দায়িত্ব বিমানবন্দরের ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থার, যা তারা তাৎক্ষণিকভাবে পালন করেছে।
আবু সাঈদ খান আরও বলেন, অনেক সময় বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার জন্য বেবিচককে দায়ী করা হলেও বাস্তবে কার্গো হ্যান্ডলিং ও পণ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অপারেটর সংস্থার ওপরই ন্যস্ত। তাই বিষয়টি সঠিকভাবে বোঝার জন্য পুরো কার্গো পরিচালনা প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
বিমান মুখপাত্রের অভিমত
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বলেন, আমদানি কার্গো দ্রুত ডেলিভারির জন্য বিমান ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত থাকে। তবে পণ্য হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হওয়ায় এজেন্ট উপস্থিত না থাকলে বিমান একতরফাভাবে পণ্য ডেলিভারি দিতে পারে না।
তার দাবি, সব সময় ২৪ ঘণ্টা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের পাওয়া যায় না, ফলে কিছু ক্ষেত্রে ডেলিভারিতে বিলম্ব হয়।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে কার্গো পণ্যের লোকেশন খুঁজে না পাওয়ার যে অভিযোগ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা প্রয়োজন।
তার ভাষায়, কোন পর্যায়ে এবং কী কারণে তারা পণ্যের অবস্থান জানতে পারছেন না, সেটি স্পষ্ট করে বলতে হবে।
বোসরা ইসলাম আরও বলেন, ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি পণ্য একসঙ্গে সংরক্ষণ করতে হলে সেগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতে সময় লাগতে পারে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আজকের সিলেট ডেস্ক 








