যুদ্ধের উত্তাপ ও বর্ণবাদের কলঙ্ক বিশ্বকাপে
রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০৪:০৫ PM

যুদ্ধের উত্তাপ ও বর্ণবাদের কলঙ্ক বিশ্বকাপে

ক্রীড়া ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১/০৬/২০২৬ ১০:৩০:৩৩ AM

যুদ্ধের উত্তাপ ও বর্ণবাদের কলঙ্ক বিশ্বকাপে


সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দলের অংশগ্রহণে যুক্তরাষ্ট্রে চলছে ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। ইতোমধ্যেই জমে উঠেছে প্রতিযোগিতা। চমক, অঘটন সবকিছুই হচ্ছে। তবে বিশ্ব রাজনীতির নানা বিতর্ক এবারের ফিফা বিশ্বকাপে একে দিয়েছে কলঙ্কের তিলক। বিশেষ করে ইরান দলের কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা ও ম্যাচ শেষে তাৎক্ষণিকভাবে খেলোয়াড়দে বের করে দেওয়াটা ছিল এই বিশ্বকাপের নিষ্ঠুরতম ঘটনা।

শুধু ইরান নয়, শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে খেলোয়াড় ও অফিসিয়ালদের প্রবেশে কড়াকড়ি নিয়ে ছিল বিতর্ক।ব্রাজিল, উরুগুয়ে, সেনেগাল, উজবেকিস্তানের ফুটবলাররাও দেশটিতে প্রবেশ করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাড়াবাড়ির কারণে হেনস্তার শিকার হন। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই নিষিদ্ধ করা হয় আসরের সবচেয়ে কম বয়সী সোমালিয়ান রেফারি ওমর আরতানকে। বিশ্বকাপ ঘিরে যেসব দল ও ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন, তা নিয়েই এই আয়োজন।

‘নিপীড়িত’ ইরান
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। তবে ইরান শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের এই আসর বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়নি। দলটি বিশ্বকাপে অংশ নিলেও তাদের প্রতি চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করে আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়তে হয় ইরানের ফুটবলারদেরও। ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচ ছিল ইরানের। ‘জি’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হলো বেলজিয়াম ও মিশর।

লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রথম ম্যাচের আগে ইরানের খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদের ভিসা নিয়ে শুরুতেই জটিলতা দেখা দেয়। দেশটির মোট ১৫ জনের প্রতিনিধিদল ভিসার জন্য আবেদন করলে প্রথম দফায় সবার আবেদনই নাকচ হয়। পুনরায় ১০ জন ভিসার জন্য আবেদন করলে তার মধ্য থেকে মাত্র ৪ জনকে ভিসা দেওয়া হয়। ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা ভিসা পাননি। বাতিল করা হয় তাদের অনেক সমর্থকের মাঠে প্রবেশের অধিকারও।

এদিকে ইরানকে বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাম্পে অংশ নেয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি। মেক্সিকোর তিহুয়ানা শহরে অস্থায়ী ক্যাম্প করে নিতে হচ্ছে প্রস্তুতি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় ম্যাচের আগের দিন। তবে ইরান দলের সঙ্গে সবচেয়ে অমানবিক ঘটনাটি ঘটে প্রথম ম্যাচ শেষে। সেদিন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় দলের খেলোয়াড়দের।

যে কারণে ম্যাচ শেষে স্বাভাবিক বিশ্রামের সুযোগ ছাড়াই তাদের প্রায় দেড়শ কিলোমিটার ভ্রমণ করে যেতে হয় মেক্সিকোতে। এ কারণে বিশ্বকাপে নিজেদের সবচেয়ে ‘নিপীড়িত’ দল হিসেবে অভিহিত করেছেন ইরানের কোচ আমির গালেনোই।

সোমালিয়ান রেফারিকে ফিরিয়ে দেওয়া 
আফ্রিকার সেরা রেফারি হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপের এই আসরে অংশ নিতে এসেছিলেন সোমালিয়ান ওমর আরতান। ফিফার ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ৫২ জন রেফারির মধ্যে একজন ছিলেন তিনি। প্রথম সোমালিয়ান হিসেবে বিশ্বকাপে রেফারির দায়িত্ব পালনের সুযোগ এসেছিল তার সামনে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদী আচরণের কারণে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন ৩৪ বছর বয়সী ওমর আরতান।

গত ৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ওমর আরতানকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। দেশটির প্রশাসন জানিয়েছে, সন্ত্রাসী সংগঠনের সন্দেহভাজন সদস্যদের সঙ্গে যোগসূত্র থাকায় তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

তবে আরতান জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে সোমালিয়ার জঙ্গিগোষ্ঠী আল শাবাবের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। আরতান বলেন, আমার কাছে সব বৈধ কাগজপত্র ছিল। সঠিক ভিসাও ছিল। আমি শুধু একজন রেফারি, যে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিলাম। বিশ্বকাপে আসা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।

পরে তাকে তুরস্কগামী বিমানে তুলে দেওয়া হয়। ইস্তাম্বুলে ফিফা কর্মকর্তাদের সহায়তা নিয়ে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুতে ফেরেন তিনি। ফিফা অবশ্য ইতোমধ্যে আরতানকে পুরো ম্যাচ ফি’র অর্থ পরিশোধের ঘোষণা দিয়েছে।

উরুগুয়ে দলকে প্রবেশে বাধা
সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলতে যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার পথে বাধার মুখে পড়ে উরুগুয়ে ফুটবল দল। যথাসময়ে ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র সরবরাহ করতে পারেনি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। যে কারণে মাঠে অনুশীলনের সুযোগ মিস করেছে দলটি। শেষ পর্যন্ত জটিলতা কাটিয়ে ১৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখে দলটি। ১৬ জুন অনুষ্ঠিত ম্যাচে তারা সৌদি আরবের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে।

কঠোর তল্লাশির ‍মুখে ব্রাজিল দল 
বিশ্বকাপে অংশ নিতে গত ২ জুন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেই কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশির মুখে পড়ে ব্রাজিল ফুটবল দল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের পুরো বহরকে দীর্ঘ সময় ধরে অভিবাসন ও নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম ‘জার্নাল ও গ্লোবো’।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে অবতরণের পর ব্রাজিল দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও সহায়ক কর্মী—কাউকেই বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়নি। বিশ্বখ্যাত তারকা ফুটবলারদেরও সাধারণ যাত্রীদের মতোই কঠোর নিরাপত্তা পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সবাইকে মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। লাগেজ, ব্যক্তিগত ব্যাগ ও অন্যান্য সামগ্রী বিস্তারিতভাবে স্ক্যান করা হয়। এমনকি খেলোয়াড়দের জুতা খুলেও তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই দীর্ঘ ও কঠোর প্রক্রিয়ায় বিমানবন্দরে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে ব্রাজিল দলকে। বিষয়টি খেলোয়াড়দের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর হলেও আয়োজক দেশের নিরাপত্তা বিধির কারণে তাদের সব নিয়ম মেনে চলতে হয়েছে।

খোলা আকাশের নিচে ফুটবলারদের তল্লাশি
যুক্তরাষ্ট্রে ফিফা বিশ্বকাপ শুরুর আগে যেসব ঘটনা তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সেনেগাল ফুটবল দলের সদস্যদের খোলা আকাশের নিচেই তল্লাশি করা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, সাদিও মানে ও কালিদু কুলিবালির মতো বিশ্বমানের তারকাদের উপস্থিতিতে সেনেগালের পুরো দলকে টেক্সাসের সান আন্তোনিও বিমানবন্দরের টারম্যাকে (রানওয়ের পাশে) মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। ফুটবলাররা বিমান থেকে নামার পর খোলা আকাশের নিচেই তাদের মালপত্রের পাশে দাঁড়িয়ে এই পরীক্ষার মুখোমুখি হন।

ভিডিওটি ভাইরাল হতেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের একাংশ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। অনেকেই অভিযোগ করেন, স্পেন বা অন্যান্য ইউরোপীয় দলের ক্ষেত্রে এমন দৃশ্য দেখা যায়নি। তবে সেনেগালের মতো আফ্রিকান দলের সঙ্গে কেন এই বৈষম্যমূলক আচরণ করা হলো?

নিউইয়র্কে উজবেকিস্তান দলের সঙ্গেও একই ধরনের আচরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের তল্লাশির জন্য কুকুরও আনা হয় বলে অভিযোগ। পুরো বিষয়কে অনেকেই ‘অপমানজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

অবশ্য সেনেগালিজ ফুটবল ফেডারেশন একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় যা ছড়াচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভুল বোঝাবুঝি। এই তল্লাশি সান আন্তোনিওতে নামার পর হয়নি, বরং নর্থ ক্যারোলাইনার রলি বিমানবন্দর থেকে সান আন্তোনিও যাওয়ার ব্যক্তিগত বিমানে ওঠার সময় করা হয়েছিল।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর