ইলিয়াস আলীর গুমের সেই কালো রাতের বর্ণনা দিলেন সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস
রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০৯:৩৯ PM

ইলিয়াস আলীর গুমের সেই কালো রাতের বর্ণনা দিলেন সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১/০৬/২০২৬ ০৭:০৭:২৪ PM

ইলিয়াস আলীর গুমের সেই কালো রাতের বর্ণনা দিলেন সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস


আওয়ামী লীগের শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তারই একসময়কার বডিগার্ড বা রানার সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস। জবানবন্দিতে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমের বর্ণনা তুলে ধরেছেন তিনি। এ সময় নিজের নিরপাত্তাও চেয়েছেন এ সেনাসদস্য।

বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রোববার এই ৫ম সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এ সময় জিয়াউল আহসান ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। ইমরুল কায়েস বর্তমানে রংপুর সেনানিবাসে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। 

জবানবন্দিতে ইমরুল বলেন, ‘২০১২ সালের ১৩ এপ্রিল র‌্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে মেজর জিয়াউল, মেজর নওশাদ, সাইফসহ মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে যাই। কে বা কাকে গাড়িতে তুলবে তা আমি জানতাম না। তবে গাড়িতে বসে জিয়াউল আহসান বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন- টার্গেট কখন আসবেন। একপর্যায়ে জানা যায় টার্গেট আসবেন না। পরে সেখান থেকে জিয়াউল আহসানকে বাসায় নামিয়ে দেই। পরদিন সকালে আমি ৯ দিনের ছুটিতে বাড়ি যাই। ছুটিতে থাকাকালে ১৮ এপ্রিল বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে মহাখালী থেকে অপহরণ করা হয়।’

সাক্ষী ইমরুল কায়েস আরও বলেন, ‘এরপর ছুটি শেষে ২৩ এপ্রিল র‌্যাব হেডকোয়ার্টারের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে যোগ দেই। যোগদানের পর কর্মস্থলে থমথমে পরিবেশ লক্ষ্য করি। এছাড়া সাধারণত প্রতিদিন সকাল ৯টায় রোল-কল হতো। কিন্তু ১৮ এপ্রিলের পর সকাল ৭টায় হয়েছিল। এভাবে বেশ কয়েকদিন সকালে আসতেন জিয়াউল আহসান।’ তিনি বলেন, ‘একদিন ফোনে কথা বলছিলেন জিয়াউল আহসান। এর মধ্যে তার আরেকটি ফোনে কল আসে। তখন জিয়া সার বলছিলেন—তুই রাখ। তারিক স্যার (সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী) ফোন দিয়েছেন।’


ফোনে জিয়াউল ও তারিক স্যারের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়—উল্লেখ করে সেনা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘একপর্যায়ে জিয়াউল স্যার বলে ওঠেন—আপনাদের কথামতো ইলিয়াস আলীকে গলফ (গুম) করলাম। এখন আপনারা এরকম করলে হবে? আমি কমান্ডো মানুষ। তাহলে পোস্টিং দিয়ে জঙ্গলে পাঠিয়ে দেন।’

এছাড়া ইলিয়াস আলীকে গুমের পর অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল র‌্যাব হেডকোয়ার্টারের বেশ কিছু সিসিটিভির ফুটেজ ধ্বংস করে ফেলেন বলেও জানান এ সাক্ষী। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি এক বছর তিন-চার মাস জিয়াউল আহসানের বডিগার্ড বা রানার ছিলাম। আমি সে সময় দেখেছি তিনি ওই সময়ে ১৫০/২০০ মানুষকে বিভিন্নভাবে হত্যা করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিয়েছি। এখন আমি নিরাপত্তা চাই।’

যা বললেন চিফ প্রসিকিউটর
বিএনপির নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীকে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান অপহরণ করেছিলেন, তা প্রমাণিত। তদন্ত ও প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ইলিয়াস আলীর অপহরণের ঘটনায় জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে। আজ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান তিনি।  

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের কিলিং নেটওয়ার্ক ভারত-বাংলাদেশজুড়ে ছিল। আওয়ামী লীগের শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউলের বিরুদ্ধে আজ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিয়েছেন একজন সেনা কর্মকর্তা। তার জবানবন্দি এখনও চলমান রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, এর মধ্যে একটি ছিল জিয়াউলের জাফলং অপারেশন’। অর্থাৎ র‌্যাবের টিএফআই সেল থেকে দুজন আসামিকে নিয়ে জিয়াউলের নেতৃত্বে জাফলংয়ে গিয়েছিলেন সাক্ষীসহ আরও কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা। সেখানে যাওয়ার পর আরও দুজন আসামিকে নিয়ে আসেন ভারত থেকে আসা সাদা পোশাকের কিছু লোকজন। এরপর এসব আসামিকে বিনিময়ের মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়।

সাক্ষীর বিবরণ দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘ভারত থেকে আনা দুজনকে রাস্তায় মাথায় গুলি চালিয়ে হত্যা করেন জিয়াউল আহসান। এভাবেই তিনি হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন।’

আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, ‘বিডিআরের বিভিন্ন সদস্যকে ধরে এনে দুটো পদ্ধতিতে হত্যা করেছেন জিয়াউল আহসান। এর মধ্যে কাউকে ইনজেকশন পুশ করে, আবার কাউকে মাথায় গুলি ঠেকিয়ে হত্যার পর নদীতে ফেলে দিতেন। এই দুই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০ থেকে ১২ জন বিডিআর সদস্যকে তিনি হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন সাক্ষী।’

সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গাজীপুরে তিনজনকে হত্যা ছাড়াও বরগুনার পাথরঘাটার চর দুয়ানিতে ৫০ জন হত্যা, বনদস্যু দমনের নামে সুন্দরবনে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে বেশ কয়েকজনকে হত্যার তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে।

আজকের সিলেট/এপি

সিলেটজুড়ে


মহানগর