‘বাবা’ নিয়ে কালজয়ী গানগুলোর অজানা গল্প
সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ০২:৫৭ PM

‘বাবা’ নিয়ে কালজয়ী গানগুলোর অজানা গল্প

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২/০৬/২০২৬ ১০:২১:১০ AM

‘বাবা’ নিয়ে কালজয়ী গানগুলোর অজানা গল্প


বাংলা গানে ‘মা’কে নিয়ে অসংখ্য জনপ্রিয় গান থাকলেও ‘বাবা’কে নিয়ে কালজয়ী গানের সংখ্যা তুলনামূলক কম। তবে যে গানগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোর অনেকই সময় পেরিয়ে আজও শ্রোতাদের আবেগে নাড়া দেয়। বাবা দিবস এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশনের বিশেষ আয়োজন কিংবা ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে ফিরে আসে এসব গান। এমন কয়েকটি গানের পেছনের গল্প তুলে ধরা হলো।

জেমসের ‘বাবা’
বাংলাদেশে বাবাকে নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় গানের তালিকায় শুরুর দিকেই থাকবে নগর বাউলখ্যাত জেমসের গাওয়া ‘বাবা’। ‘বাবা কতদিন, কতদিন দেখিনা তোমায়’- গানটি বছরের পর বছর ধরে বাবাকে স্মরণ করার অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে আছে।

গানটির গীতিকার ও সুরকার প্রিন্স মাহমুদ এক সাক্ষাৎকারে জানান, শুরুতে জেমস গানটি গাইতে আগ্রহী ছিলেন না। স্টুডিওতে গানটি শোনার পর তিনি অন্য একটি গান চেয়েছিলেন। তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত শিল্পী হাসান আবেদুর রেজা জুয়েল। একপর্যায়ে জুয়েলকে গানটি গাওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।

প্রিন্স মাহমুদের কথায়, জুয়েল ভাই তখন ‘বিদায় শব্দটা কেন এত যন্ত্রণাময়’ এটা গেয়ে ফেলছে, তখন আমি জুয়েল ভাইকে বললাম আপনি বাবা গানটি গান, জেমস ভাইকে এটা দিয়ে দেই- বলছিলেন তিনি।

পরের দিন আবারও স্টুডিওতে আসেন তারা তিনজন। জেমস তখন ‘বিদায় শব্দটা কেন এত যন্ত্রণাময়’ গানটা শুনে রেকর্ডিং শুরুর ঠিক আগে আবার বাবা গানটা শুনতে চান। এদিকে জুয়েল ভাই তো বাবা গানটা মোটামুটি বোধহয় তুলে ফেলছে, কিন্তু জুয়েল ভাই এত ভালো মানুষ ছিল… পরে জেমস ভাই এসে বলে ঠিক আছে এটাই গাই।

হেমন্ত-শ্রাবন্তীর ‘আয় খুকু আয়’
বাবা ও মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে বাংলা গানের অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘আয় খুকু আয়’। গানটির গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুরকার পণ্ডিত ভি. বালসারা। গানটিতে কণ্ঠ দেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদার।

গানটি মূলত শ্রাবন্তী মজুমদারের অ্যালবামের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এর সুরকার ভি. বালসারার প্রাথমিকভাবে গানটি পছন্দ হয়নি, কারণ এতে কিছু ইংরেজি শব্দ বা আধুনিক ধাঁচের রূপ ছিল সেটার তেমন প্রচলন সেসময় ছিল না। কলকাতার ডিডি বাংলার এক সাক্ষাৎকারে এভাবে বর্ণনা করেছিলেন শ্রাবন্তী মজুমদার।

তার আগ্রহেই সুরকার বালসারা রাজি হন এবং তিনি চেয়েছিলেন গানটি তার সঙ্গে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইবেন। তারা একসাথে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছে যান।

শ্রাবন্তী মজুমদার বলেন, ‘আমার বুক দুরু দুরু করছে যদি হেমন্ত দা বলেন আমি করবো না… হেমন্ত দা পড়েই বললেন- আমি গাইবো’। তিনি ভি. বালসারাকে অনুরোধ করেন যেন সুরটা খুব সিম্পল ও বৈচিত্র্যহীন হয় যেন সবাই সহজে গাইতে পারে।

তিনি বলেন, এরপর বাধা হয়ে দাঁড়ালো গানটা লম্বা হয়ে যাওয়া। গানটা এত বড়, আমাদের তো তখন সাড়ে ছয় মিনিটের বেশি করা যাবে না। তো মি. বালসারা, আমি আর পুলকদা গেলাম হেমন্তদার কাছে। মি. বালসারা গিয়ে বললেন যে হেমন্ত দা, যদি শেষের দুইটা লাইন বাদ দেওয়া যায় তাহলে গানটা ঠিকমতো মিউজিকে আসে।

শ্রাবন্তী মজুমদারের কথায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন- গানের দুই লাইন যদি বাদ দাও তাহলে আর গানটা দাঁড়ায় না, তুমি তোমার মিউজিক বাদ দিয়ে দাও, ফেলে দাও। এই দুটো লাইন থাকতেই হবে। পরে সেসব রেখেই মিউজিক কম্পোজ করেন মি. বালসারা। ওই সময় গানের রেকর্ডিং এখনকার মতো বারবার করার সুযোগ ছিল না। সবাই মিলে একসাথে এক-দুইবারে যেমন হয়। এইটা তিনবার রেকর্ড করা হয়েছিল। পরবর্তীতে গানটি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে ব্যাপক পরিচিতি পায়।

এন্ড্রু কিশোরের ‘বাবার মুখে শুনেছিলাম গান’
১৯৮৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নয়নের আলো’ চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি হয়েছিল ‘বাবার মুখে শুনেছিলাম গান’। গানটির কথা ও সুর করেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আর কণ্ঠ দেন এন্ড্রু কিশোর।

এক সাক্ষাৎকারে প্রয়াত আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বলেছিলেন,  এই চলচ্চিত্রের গানের কাজ পাওয়া হিমালয় পর্বতের চূড়ায় ওঠার মতো ছিল। সেসময় অনেকের মাঝে বসিয়ে কড়া মন্তব্যের মুখে তাকে পড়তে হতো বলছিলেন তিনি।

তার কথায়, ঐ সময় তো সাউন্ডপ্রুফ রুম ছিল না, আমার বাসায় বসে বসে টিউন করতাম, ক্যাসেট রেকর্ডারে গানগুলো ধারণ করতাম। তো কখন মুরগি ডাকলো কখন কুকুর ডাকলো সেটা আমি শুনতে পেতাম না। ওরা ঠিকই গান শুনতে গিয়ে বলতো, এই মুরগী ডাকলো কেন, কুকুর ডাকলো কেন? গান আবার ঠিক করে নিয়ে আসো। এটা করতে করতে আমার জীবন বার হয়ে গেছে, এটা আমার মনে পড়ে। আগে দেশাত্মবোধক গান করলেও ‘নয়নের আলো’র জন্য গান তৈরিকে নিজ ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বলে জানান তিনি।

সুরকার ও সংগীত পরিচালক ইমন সাহা এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, ক্যারিয়ারের প্রথম দিককার সময়ে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তার বাবা সত্য সাহার কাছ থেকে নানা ধরনের পরামর্শ নিতেন।

তিনি যোগ করে বলেছিলেন, বাবা বলছে দেখ, যেটাই, করিস না কেন, আমাদের গ্রামীণ অডিএন্সটাকে, মাথায় রাখিস। সিনেমার দর্শক কিন্তু গ্রামের, লোক ঘরনার যদি কিছু করিস তাহলে দেখবি যে জিনিসটা খুব সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। ‘নয়নের আলো’ সিনেমার গানগুলো শুনলেই বুঝবেন যে কোথায় জানি, একটা মাটির গন্ধ আছে।

এই সময়ের শিল্পী তানভীর ইভানের গান- ‘বাবা তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ’ 
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিকমাধ্যমে খুব পরিচিত হয়ে ওঠা গান ‘বাবা তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ, বলো তোমার মতো করবে কে শাসন’। পিরান খানের সুরে গাওয়া এই গানটি মূলত আপন নামের একটি নাটকের জন্য গাওয়া হয়েছিল।

এ নিয়ে শিল্পী তানভীর ইভান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নাটকটির পরিচালক অমি ভাই পিরানকে ফোন করে বলেন, ‘বাবাকে নিয়ে একটা গান লাগবে। পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর আমরা বসে গানটা তৈরি করি।’ তানজিব সৌরভের লেখা কথায় সুর করেন পিরান। মেহেদীবাগের (চট্টগ্রাম) স্টুডিওতে গানটা তৈরি করি।

সরাসরি বাবা নিয়ে নয়, কিন্তু ব্যাপক পরিচিত
এমন বেশ কিছু গান রয়েছে যেগুলো সরাসরি বাবাকে নিয়ে গান না, কিন্তু মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিত। এর মাঝে প্রথমেই থাকবে মান্না দের ‘তুই কি আমার পুতুল পুতুল সেই ছোট্ট মেয়ে’। এ টি মেয়েকে নিয়ে বাবার গান।

গানটি নিয়ে মান্না দে তার আত্মজীবনী ‘জীবনের জলসা ঘরে’ বইতে উল্লেখ করেছেন। গীতিকার মিল্টু ঘোষের লেখা গানটি সুপর্ণকান্তি ঘোষকে গানটি সুর করতে বলেছিলেন তিনি সঙ্গীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষের ছেলে সুপর্ণকান্তিকে তিনি খোকা বলতেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই খোকার গানটির কথা সেভাবে পছন্দ হয়নি। কিন্তু সেটা অবিবাহিত তরুণ খোকার জন্য স্বাভাবিক বলেই বর্ণনা করেন তিনি।

মান্না দে বইয়ে লেখেন, মেয়েকে বিদায় দেওয়ার নাড়ী-ছেঁড়া অসহ্য যন্ত্রণার সে অভিজ্ঞতা আমার আছে। দু-দু’বার সেই নাড়ী-ছেঁড়া যন্ত্রণায় কেঁদেছি আমি। তাই আমি জানি ভাষাটা সত্যিই মনের কথা থেকেই হয়েছে।

আরেকটি গান হচ্ছে- ‘বাবা বলে গেল আর কোনোদিন গান করো না’। এটি লিখেছেন আমজাদ হোসেন, সুর করেছেন আলাউদ্দিন আলীর ও গেয়েছেন শামীমা ইয়াসমিন দিবা। বাবার শাসন থেকে শুরু হওয়া এই গানটির মূল থিম অবশ্য গান গাওয়া, বাবা নয়। তবে ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ সিনেমায় এই গানটি অনেক বেশি পরিচিত।

আরও যেসব গান বাবাকে মনে করিয়ে দেয়
বাবাকে নিয়ে বাংলা গানের ভাণ্ডারে আরও রয়েছে বহু জনপ্রিয় গান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ও সৈয়দ আব্দুল হাদীর কণ্ঠে ‘বাবার কথা মনে পড়ে’, আইয়ুব বাচ্চুর ‘বাবা তোমার কথা মনে পড়ে’, আসিফ আকবরের ‘বাবা নেই’, মিল্টন খন্দকারের লেখা ও ঝিনুকের গাওয়া ‘আমি যাচ্ছি বাবা’, মনির খানের ‘বাবা তোমার ছেলে আজ বড় হয়েছে’ এবং সম্প্রতি আলোচিত ‘জংলি’ চলচ্চিত্রের জন্য প্রিন্স মাহমুদের সংগীতায়োজনে তৈরি ‘বাবা তোমায় ছাড়া’।

সময়ের সঙ্গে সংগীতের ধারা বদলেছে, এসেছে নতুন প্রজন্মের শিল্পী। তবে বাবাকে নিয়ে লেখা এসব গান আজও একইভাবে মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, জাগিয়ে তোলে স্মৃতি, ভালোবাসা আর না বলা অনুভূতির গল্প। 

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর