বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন

চিকিৎসক সংকট, অচল ২৭ যন্ত্র, ভোগান্তিতে রোগীরা

সমস্যায় জর্জড়িত মৌলভীবাজার সদর হাসপাতাল

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২১/১০/২০২৬ ১০:২৪:৩৯ পূর্বাহ্ন

সমস্যায় জর্জড়িত মৌলভীবাজার সদর হাসপাতাল


চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবলের সংকট, অচল রোগনির্ণয় যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের ঘাটতিতে ব্যাহত হচ্ছে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা। জেলার সাতটি উপজেলার প্রায় ২২ লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা এই হাসপাতালে এসে অনেক রোগীকেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে যেতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে। এতে বাড়ছে চিকিৎসার খরচ ও ভোগান্তি। পাশাপাশি রোগীদের দালালের খপ্পরে পড়ার অভিযোগও রয়েছে।

হাসপাতালটিতে প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে দেড় হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। অন্যদিকে, ২৫০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি থাকেন প্রায় ৩৫০ থেকে ৪৫০ জন, কোনো কোনো দিন এ সংখ্যা আরও বাড়ে। অতিরিক্ত রোগীদের ওয়ার্ডের মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৪১২টি পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ১০৯টি। এর মধ্যে ৮৪টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৯ জন। শূন্য রয়েছে ৪৫টি পদ। অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত রয়েছেন একজন চিকিৎসক এবং স্বেচ্ছায় অবসরের জন্য আবেদন করেছেন দুজন। এ ছাড়া কয়েকজন চিকিৎসক প্রশিক্ষণে রয়েছেন। কিছু কর্মচারীও অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত রয়েছেন।

বিভাগভিত্তিক সংকটের মধ্যে অর্থোপেডিক, সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসকের ঘাটতি প্রকট। নাক-কান-গলা ও চর্মরোগসহ কয়েকটি বিভাগেও দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক নেই।

হাসপাতালের অন্যান্য পদেও রয়েছে শূন্যতা। নার্স ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারীর ১৯০টি পদের মধ্যে শূন্য ২১টি। তৃতীয় শ্রেণির ৫৫টি পদের মধ্যে ১৬টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ২২টি পদের মধ্যে ১৩টি শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া চতুর্থ শ্রেণির আউটসোর্সিংয়ের ৬১টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ১৪টি।

চিকিৎসকের পাশাপাশি টেকনোলজিস্ট ও প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকটেও ব্যাহত হচ্ছে রোগনির্ণয় কার্যক্রম। হাসপাতালে ১৪ জন টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন ৯ জন। জনবল ও রিএজেন্টের ঘাটতির কারণে সপ্তাহে মাত্র তিন দিন এক্স-রে, দুই দিন সিটি স্ক্যান এবং চার দিন আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা চালু থাকে। এমআরআই সেবা পুরোপুরি বন্ধ।

হাসপাতালের সিসিইউ ও আইসিইউ কার্যকর নেই। ডায়ালাইসিস সেবায়ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য ও ফ্লুইডের সংকট রয়েছে। প্যাথলজির বড় যন্ত্রগুলোর কয়েকটি রিএজেন্ট ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে বন্ধ পড়ে আছে।

২০১৯ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে রক্ত পরীক্ষার জাপানি মেশিন, এমআরআই মেশিনসহ মোট ২৭টি যন্ত্রপাতি নানা কারণে পুরোপুরি অচল হয়ে আছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এমআরআই মেশিনটিকে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ফিলিপস সম্পূর্ণ অকেজো ঘোষণা করেছে।

ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডে সপ্তাহে দুবার সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে একবার দেওয়া হচ্ছে। অর্থ ও প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকটে এ সেবাও যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ না পেয়ে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। এতে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো আর্থিক চাপে পড়ছে।

হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা উন্নত করতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগ, অচল যন্ত্রপাতি সচল করা এবং নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের মৌলভীবাজারের সভাপতি ডা. সাদিক আহমেদ বলেন, জেলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন। এ নিয়ে আন্দোলনও হয়েছে, কিন্তু কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিকে দ্রুত ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার পাশাপাশি জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হোক।

রোগী কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব বলেন, সাধারণত দরিদ্র মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাঁদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তিনি দ্রুত হাসপাতালের সমস্যাগুলো সমাধানের দাবি জানান।

মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাস বলেন, হাসপাতালে নানা ধরনের সংকট রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে এবং বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, জনবল সংকটের মধ্যে বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ওষুধেরও কিছুটা ঘাটতি রয়েছে, যা সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর