জনবল-যন্ত্রপাতির সংকটে মৌলভীবাজারের প্রধান হাসপাতালে ভোগান্তি ২১ লাখ মানুষের
বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩১ AM

জনবল-যন্ত্রপাতির সংকটে মৌলভীবাজারের প্রধান হাসপাতালে ভোগান্তি ২১ লাখ মানুষের

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৯/০৯/২০২৬ ০৮:৩৫:২৯ AM

জনবল-যন্ত্রপাতির সংকটে মৌলভীবাজারের প্রধান হাসপাতালে ভোগান্তি ২১ লাখ মানুষের


মৌলভীবাজারের প্রায় ২১ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতাল। অথচ প্রয়োজনীয় জনবল, শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা চলছে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে। ৮৪ জন চিকিৎসকের অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪২ জন। এর মধ্যে ৭ জন সিনিয়র কনসালটেন্টও অনুপস্থিত।

হাসপাতালটিতে ৪০৮টি অনুমোদিত পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ১০৩টি। চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স, টেকনোলজিস্টসহ বিভিন্ন পদে জনবল ঘাটতির কারণে প্রতিদিনের অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। ধারণক্ষমতার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় শয্যা না পেয়ে অনেককে মেঝে ও বারান্দায় অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বহির্বিভাগেও রোগীর চাপ বাড়ছে। অনেক রোগী ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চিকিৎসকের দেখা পান না বলে অভিযোগ করেছেন।


চিকিৎসকের ঘাটতির পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। ল্যাব ও এক্স-রে বিভাগে ১৪ জন টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন। জনবল সংকটের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব যুক্ত হওয়ায় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সেবা সীমিত হয়ে পড়েছে।

হাসপাতালে বর্তমানে সপ্তাহে মাত্র তিন দিন এক্স-রে, দুই দিন সিটিস্ক্যান এবং চার দিন আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা চালু থাকে। এমআরআই সেবা পুরোপুরি বন্ধ। একই সঙ্গে অচল রয়েছে সিসিইউ ও আইসিইউ। ডায়ালাইসিসের প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যেরও সংকট রয়েছে।

ডায়ালাইসিস সেবার জন্য প্রায় ২০০ জন রোগী অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা না পাওয়ায় অনেক কিডনি রোগী ভোগান্তিতে পড়ছেন এবং চিকিৎসার অভাবে অনেকের মৃত্যুও হচ্ছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা পারুল বেগম বলেন, মেডিসিনের অভাবে তাঁর ব্লাড টেস্ট করা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, এখানে প্রাথমিক চিকিৎসার বাইরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া কঠিন এবং সামান্য জটিলতা দেখা দিলেই রোগীকে সিলেটে পাঠানো হয়। টাকা খরচ করেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা না পাওয়ার কথা জানান তিনি।

কিডনি রোগী আলতা মিয়া জানান, ডায়ালাইসিসের জন্য যোগাযোগ করেও তিনি শিডিউল পাননি। তাঁর ভাষ্য, জেলার একমাত্র চিকিৎসা কেন্দ্রটি জোড়াতালি দিয়ে চলছে। এমআরআই, সিসিইউ ও আইসিইউ সেবা একেবারেই নেই।

রোগীর স্বজন ইয়ামিন মিয়া জানান, তাঁর শাশুড়ির আলট্রাসনোগ্রাফি প্রয়োজন হলেও হাসপাতালে গিয়ে তিনি জানতে পারেন সেবাটি বন্ধ। পরে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, অতিরিক্ত রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। টয়লেটসহ বিভিন্ন স্থানেও এর প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালের অবকাঠামোগত সমস্যাও রোগীদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে ছাদ ও দেয়াল চুইয়ে পানি হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করছে। অভ্যন্তরীণ রোগ নির্ণয় ও ল্যাব পরীক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাচ্ছে দালাল চক্র এমন অভিযোগও রয়েছে।

মৌলভীবাজারের সচেতন নাগরিকেরা দীর্ঘদিন ধরে জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, মেডিকেল কলেজ হলে জেলার চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে এবং অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমানে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকলেও জটিল রোগের চিকিৎসা কার্যত সীমিত; সামান্য জটিলতাও দেখা দিলে রোগীদের সিলেটে রেফার্ড করা হয়। চিকিৎসার অভাবে শত শত দরিদ্র মানুষ মারা গেলেও বিষয়টি যথাযথভাবে হিসাবের মধ্যে আসছে না বলেও তাঁরা দাবি করেন।

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, হাসপাতালে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে এবং এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তবে হাসপাতাল পরিচালনার জন্য নিজস্ব বোর্ড থাকায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাইলেও সবকিছু করা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাস বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ বেশি থাকায় সংকট তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য তাঁরা কাজ করছেন এবং বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। সীমিত জনবল নিয়ে এত বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসার চাপ সামাল দেওয়া অনেক কঠিন।

সব মিলিয়ে চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতি, অচল গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি, সীমিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শয্যার সংকটে মৌলভীবাজারের প্রধান এই হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অসংখ্য রোগী। জেলার ২১ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্রটির এসব সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর