তুষের আগুনে বিকল্প জ্বালানি, সিলেটে বাড়ছে ‘কালো লাকড়ি’র চাহিদা
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০০ PM

তুষের আগুনে বিকল্প জ্বালানি, সিলেটে বাড়ছে ‘কালো লাকড়ি’র চাহিদা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৮/০৯/২০২৬ ০৯:৪৬:৪৪ AM

তুষের আগুনে বিকল্প জ্বালানি, সিলেটে বাড়ছে ‘কালো লাকড়ি’র চাহিদা


ধানের তুষ, যন্ত্রের চাপ আর আগুনের বিকল্প এক গল্প। সিলেট নগরীর শেখঘাট এলাকায় ধানের তুষ থেকে তৈরি হচ্ছে বিশেষ ধরনের জ্বালানি লাকড়ি। লম্বা ও গোলাকার আকৃতির এসব লাকড়ি স্থানীয়ভাবে কারও কাছে ‘চারকোল’, কারও কাছে ‘কালো লাকড়ি’। আবার কেউ কেউ একে ‘কয়েল লাকড়ি’ বা ‘সাদ্দাম লাকড়ি’ নামেও চেনেন। গ্যাসের দাম বাড়ায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এর ব্যবহার বাড়ছে সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায়। কলকারখানা, রেস্তোরাঁ থেকে বাসাবাড়ি বিভিন্ন জায়গায় বাড়ছে এর চাহিদা।

তবে চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উৎপাদন খরচও। চারকোল তৈরির প্রধান কাঁচামাল ধানের তুষের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর বাজারদরও ঊর্ধ্বমুখী। একসময় প্রতি কেজি চার থেকে পাঁচ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি চারকোল ১৩-১৫ টাকা এবং খুচরা বাজারে ২০-২২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

শেখঘাট এলাকার কয়েকটি কারখানায় দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ধানের তুষ যন্ত্রের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। পরে চাপ প্রয়োগ করে তৈরি করা হচ্ছে লম্বা ও গোলাকার আকৃতির লাকড়ি। উৎপাদনের পর এসব লাকড়ি শুকিয়ে বাজারজাত করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ধানের তুষই এসব লাকড়ির প্রধান কাঁচামাল। সিলেটের বিভিন্ন এলাকা থেকে তুষ সংগ্রহ করে মেশিনে প্রক্রিয়াজাত ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তৈরি করা হয় জ্বালানি লাকড়ি। প্রচলিত কাঠের তুলনায় এটি তুলনামূলকভাবে জ্বালানিসাশ্রয়ী হওয়ায় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে এর ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে রেস্তোরাঁ, কমিউনিটি সেন্টার ও বাসাবাড়িতে এসব লাকড়ি ব্যবহৃত হচ্ছে।

বর্তমানে পাইকারি বাজারে এসব লাকড়ি প্রতি কেজি ১৩ থেকে ১৫ টাকা এবং খুচরা বাজারে ২০ থেকে ২২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ধানের তুষের পাশাপাশি বিদ্যুতের মূল্য বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। আর সেই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব পড়েছে বাজারদরে।

একসময় সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলো ছিল এসব লাকড়ির বড় একটি বাজার। ব্যবসায়ীরা জানান, কোয়ারি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেখানে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি লাকড়ির চাহিদা কমে যায়। ফলে চারকোলের বাজারেও এর প্রভাব পড়ে।

তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংযোগ না থাকায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এসব লাকড়ির চাহিদা আবার বাড়ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও ছোট-বড় কলকারখানায়ও এর ব্যবহার বেড়েছে।

শেখঘাট এলাকার হৃদি চারকোল মিলের স্বত্বাধিকারী মো. সাইদ বলেন, একসময় পাথর কোয়ারি খোলা থাকায় চারকোলের প্রচুর চাহিদা ছিল বাজারে। কোয়ারি বন্ধ হওয়ায় চাহিদা কমে যায়। তবে বর্তমানে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে এই লাকড়ির চাহিদা বেড়েছে।

তিনি বলেন, লাকড়ির চুলায় রান্নার স্বাদ ভালো থাকায় সিলেটের অধিকাংশ রেস্টুরেন্ট এই লাকড়ি ব্যবহার করেন। পাঁচভাই, পানসি ও মেহমানসহ বড় বড় রেস্টুরেন্টগুলো প্রতিদিন কয়েকশ মণ লাকড়ি নিয়ে থাকে।

সাইদ আরও বলেন, ধানের তুষের দাম বাড়ায় বর্তমানে বাজার দর বেশি। বিদ্যুতের সাহায্যে মিলগুলো চালানো হয়, এজন্য দাম তুলনামূলক কম। তবে জ্বালানি তেল ব্যবহার করা হলে এই দামে লাকড়ি বিক্রি করা সম্ভব হতো না।

বন্দরবাজার এলাকার খুচরা ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন, ধানের তুষের দাম বাড়ায় পাইকারি বাজারে এই লাকড়ির দাম বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়েছে। খুব বেশিও বাড়েনি।

শেখঘাট এলাকার এ রহমান অ্যান্ড সন্স চারকোল মিলের স্বত্বাধিকারী শিপন মিয়া বলেন, বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে, পাশাপাশি ধানের তুষের দামও বেড়েছে। সবমিলিয়ে কয়েল লাকড়ির দামে কিছুটা প্রভাব পড়েছে।

ধানের তুষ থেকে তৈরি এই লম্বা-গোলাকার লাকড়ি তাই এখন সিলেটের জ্বালানি বাজারে শুধু বিকল্প কোনো পণ্য নয়; গ্যাসের বাড়তি দামের সময়ে অনেকের রান্না ও ব্যবসার চুলায় এটি হয়ে উঠেছে নির্ভরতার আরেক নাম।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর