হবিগঞ্জে ১৭১ শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ
মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৪ AM

হবিগঞ্জে ১৭১ শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৪/০৮/২০২৬ ১১:০৭:৩১ AM

হবিগঞ্জে ১৭১ শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ


একের পর বাতিল হচ্ছে বৈদেশিক অর্ডার
দৈনিক ক্ষতি হাজার কোটি টাকা
অলস সময় কাটাচ্ছেন দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক

হবিগঞ্জে গ্যাস সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। গত ২০ দিন ধরে সরবরাহ ছিল সামান্য। কিন্তু গত বুধবার থেকে পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে জেলার ১৭১টি শিল্পকারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কারখানায় বন্ধ থাকায় অলস সময় পার করছেন দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক।

কারখানা বন্ধ থাকায় প্রতিদিন কারখানাগুলোর ক্ষতি হচ্ছে হাজার কোটি টাকারও বেশি, যার বেশিরভাগই রপ্তানি আয়। একের পর এক বাতিল হচ্ছে বৈদেশিক অর্ডার।

গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ঠিক রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। ফলে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে।

গ্যাস সংকটের কথা জানিয়ে যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) আবুল হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানে মোট ছয়টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে টায়ার, স্পিনিং, ফেব্রিক্স, পেপার, পলি সিল্ক ও পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে। এগুলোর মধ্যে টায়ার এবং পাওয়ার প্ল্যান্ট বাদে সবগুলোই শতভাগ রপ্তানিমুখী।’

দৈনিক ক্ষতির পরিসংখ্যানের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে কর্মরত আছেন ১২ হাজার। সবাই এখন বেকার। সবগুলো কারখানা বন্ধ। এতে কোম্পানির দৈনিক প্রায় শতকোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।’

মহাব্যবস্থাপক আবুল হোসেন বলেন, ‘এখানকার কারখানাগুলোতে দৈনিক অনুমোদিত গ্যাসের চাহিদা ১৩.৬ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ বেশ কিছুদিন ধরে দিয়ে আসছে ৩ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট। যা দিয়ে উৎপাদন প্রায় অসম্ভব। এখন মেইটেন্যান্সের কাজ চলছে। কিন্তু বুধবার রাত ১২টা থেকে একেবারে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন কোম্পানির সবগুলো ইউনিট অনেকটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।’

বাদশা পাইওনিয়ারের মহাব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন) মো. খায়রুল আলম বলেন, ‘আমাদের দৈনিক ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে গ্যাস সরবরাহ কম ছিল। এক তৃতীয়াংশ বা এক চতুর্থাংশ পাওয়া যেত। বুধবার দুপুর থেকে গ্যাস সরবরাহ একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে কোম্পানির ১৬ হাজার শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী অলস সময় কাটাচ্ছেন। এতে কোম্পানির দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে পাঁচ কোটি টাকা।’

তিনি বলেন, শতভাগ রপ্তানিমুখী এ কোম্পানিতে স্পিনিং, টেক্সটাইল, গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক অর্ডার। সব বাতিল হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সময়মতো শিপমেন্ট না দিতে পারলে অর্ডার বাতিল হবে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানান তিনি।

এসএম স্পিনিং কারখানায় শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে সাড়ে ১৩ হাজার কর্মরত। এখন সবাই বেকার বলে জানান কারখানাটির মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার।

তিনি বলেন, বুধবার বিকেল পৌনে ৪টা থেকে আমাদের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। দৈনিক আমাদের উৎপাদন হতো ৩৮ হাজার মেট্রিক টন সুতা। সব উৎপাদন বন্ধ। ফলে দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে এক লাখ ২১ হাজার ৬০০ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড়কোটি টাকা)।

সায়হাম গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক জানান, গত ২২ জুলাই থেকে গ্যাস অনিয়মিতভাবে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। কখনো চাহিদার এক তৃতীয়াংশ, আবার কখনো এক চতুর্থাংশ দেওয়া হয়েছে। তবে বুধবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের শতভাগ রপ্তানিমুখী কোম্পানি। এখানে ২৭ হাজার শ্রমিক-কর্মকর্তা। সবাই বেকার। কোম্পানিতে বিদ্যুৎ জ্বালানোর অবস্থাও নেই। সবাই অন্ধকারে বসে আছেন। একটি কক্ষেও বিদ্যুৎ নেই। আমাদের পিডিবি বা পল্লী বিদ্যুতের কোনো লাইন নেই। আমরা নিজেরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ব্যবহার করি।’

কোম্পানির দৈনিক চাহিদা ছিল ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু এখন সরবরাহ শূন্য বলে জানান প্রকৌশলী রেজাউল হক।

তিনি বলেন, ‘কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ থাকায় দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে ২০০ কোটি টাকা। বৈদেশিক অর্ডার সব বাতিল হয়ে গেছে। নতুন অর্ডার নেয়ারতো প্রশ্নই ওঠে না। কখন গ্যাস সরবরাহ ঠিক হবে জানি না।’

রেজাউল হক বলেন, ‘গ্যাস কর্তৃপক্ষও নির্দিষ্ট করে কিছু বলছে না। আমরা তাদেরকে বলেছি যে, আপনারা বলেন ঠিক হতে কতদিন লাগবে। আমরা ততদিন অপেক্ষা করবো। কিন্তু তারাতো কিছুই জানাতে পারছে না।’

হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ) মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব বলেন, ‘আমাদের কোম্পানিতে ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। সবাই এখন বেকার। অলস সময় কাটাচ্ছেন। বেশ কিছুদিন ধরে গ্যাসের সমস্যা হলেও বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সরবরাহ শূন্য। ফলে এখানে সবগুলো কারখানার উৎপাদন একেবারেই বন্ধ রয়েছে।’

স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ বলেন, ‘আমাদের দৈনিক ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বুধবার বিকেল ৩টা থেকে সরবরাহ শূন্য। একেবারে শাটডাউন করে দেওয়া হয়েছে। এখন কারখানায় কাজ করা তিন হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। অথচ আমাদের কোম্পানি শতভাগ রপ্তানিমুখী।’

আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বায়ারদের অর্ডার নিয়ে এখন উৎপাদন করতে পারছি না। সময়মতো শিপমেন্ট করা সম্ভব না। এতে দুর্নাম হবে। এক সময় দেখা যাবে বায়াররা আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় খাতটিও ঝুঁকিতে পড়বে।’

সরেজমিন ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক কোম্পানি শতভাগ রপ্তানিমুখী। আর কিছু আছে আংশিক রপ্তানিমুখী। রপ্তানিমুখী কোম্পানিগুলোর প্রায় সবই ক্যাপটিভ পাওয়ারের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চলেছে। পল্লী বিদ্যুৎ বা পিডিবির বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে না। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে।

কোম্পানিগুলো বলছে, শুরু থেকে কখনো এমন গ্যাস সংকটে পড়তে হয়নি। গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে হঠাৎই গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেয়। শুরুতে কিছু কিছু সরবরাহ করা হলেও তা ছিল কোম্পানিগুলোর জন্য একেবারেই অপ্রতুল। কখনো এক তৃতীয়াংশ, আবার কখনো এক চতুর্থাংশ গ্যাস দেওয়া হতো। তবে একেবারেই বন্ধ করে দেওয়ায় সংকটে পড়েছে কোম্পানিগুলো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত কয়েকদিনে জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া বা বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে একাধিক চিঠি দিয়েছে। কিন্তু কোনো চিঠিতেই কী কারণে গ্যাস কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে বা বন্ধ করা হচ্ছে তার সুনির্দিষ্ট করে কিছুই লেখা নেই। এতে বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পড়েছেন কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা।

জানতে চাইলে জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী বলেন, ‌গ্যাস সংকট জাতীয় সমস্যা। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই এ সমস্যা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছি। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ বাড়ানোর কারণেই মূলত এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে তিনি জানান।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর