সংসদীয় আসন উন্নয়নে ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, বরাদ্দ বাড়ছে তিন গুণের বেশি
বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৬ PM

সংসদীয় আসন উন্নয়নে ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, বরাদ্দ বাড়ছে তিন গুণের বেশি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭/১০/২০২৬ ০৯:৪৪:০১ AM

সংসদীয় আসন উন্নয়নে ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, বরাদ্দ বাড়ছে তিন গুণের বেশি


সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে থাকা সংসদীয় আসনগুলোর উন্নয়নে বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ৯টি নতুন প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি দুটি চলমান প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত ব্যয় প্রায় ২৫ হাজার ৪১ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের হিসাবে, প্রস্তাব অনুমোদন পেলে প্রতিটি সংসদীয় আসনে গড়ে ৮০ কোটি টাকার বেশি উন্নয়ন ব্যয় হবে।

এর ফলে ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রস্তাবিত আসনপ্রতি ২৫ কোটি টাকার তুলনায় এবার গড় বরাদ্দ ২২০ শতাংশ বাড়বে। ওই প্রস্তাব অবশ্য সরকার পরিবর্তনের আগে অনুমোদন পায়নি।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সংসদীয় আসনভিত্তিক স্থানীয় উন্নয়ন বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। তখন প্রতিটি আসনের জন্য গড়ে বরাদ্দ ছিল দুই কোটি টাকা। ২০০৯ সালে তা বেড়ে ১৫ কোটি এবং ২০২০ সালে ২০ কোটি টাকা হয়। ২০২৪ সালে বরাদ্দ ২৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হলেও সেটি অনুমোদন পায়নি।

স্থানীয় সরকার বিভাগ পরিকল্পনা কমিশনে যে ৯টি নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠিয়েছে, সেগুলোর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে আটটি বিভাগভিত্তিক গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য এবং একটি সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য।

প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোতে সংসদ সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী সড়ক, সেতু, কালভার্ট, হাটবাজার, ধর্মীয় ও সামাজিক স্থাপনা নির্মাণ ও সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচনী এলাকার কোথায় কী ধরনের উন্নয়নকাজ হবে, তা নির্ধারণে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা থাকবে।

এরপর এসব কাজ বাছাই ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। এলজিইডির প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্যদের চাহিদার ভিত্তিতে উন্নয়নকাজ বাছাই ও বাস্তবায়ন করা হবে। জরুরি কাজগুলো চলমান প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হবে এবং বাকি কাজের জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে।

প্রস্তাবিত বরাদ্দের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, অর্থ বণ্টনের ক্ষেত্রে মূলত সংসদীয় আসনের সংখ্যাকে ভিত্তি ধরা হয়েছে। কোনো এলাকার জনসংখ্যা, দারিদ্র্যের হার কিংবা অবকাঠামোগত ঘাটতিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

ফলে তুলনামূলক বেশি দরিদ্র বরিশাল ও রংপুর বিভাগের আসন এবং তুলনামূলক কম দরিদ্র চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগের আসন একই ধরনের বরাদ্দ কাঠামোর মধ্যে পড়ছে। বিভাগভিত্তিক প্রস্তাবিত প্রকল্পে বরিশালের জন্য এক হাজার ২২৫ কোটি টাকা থেকে চট্টগ্রামের জন্য সর্বোচ্চ তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি চলমান প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩-এর ব্যয় আরও চার হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ জুন পর্যন্ত এ প্রকল্পে প্রায় ৪৩২ কোটি টাকা অব্যয়িত ছিল।

একইভাবে সাধারণ সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২-এ ২০৫ কোটি ২০ লাখ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। এরপরও প্রকল্পটিতে আরও ৩৬৮ কোটি টাকা যোগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া চলমান সামাজিক অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও একই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য নতুন করে দুই হাজার ৫৯০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এলজিইডির ভাষ্য, জরুরি কাজগুলো চলমান প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হবে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।

সংসদীয় আসনভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্পের আগের অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২০ সালে সংসদীয় আসনভিত্তিক গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ৬২৮টি প্রকল্প নিয়ে গবেষণা করেছিল।

গবেষণায় দরপত্র, প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিল পরিশোধ এবং জামানতের টাকা ফেরত দেওয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। বিভিন্ন পক্ষকে ৮ থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায়।

কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন ছিল গবেষণায়। পরিদর্শন করা প্রকল্পগুলোর একটি বড় অংশে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। কোথাও রাস্তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম রাখার অভিযোগ ছিল। আবার কোথাও রাস্তার প্রয়োজনীয় পাশের অংশ যথাযথভাবে নির্মাণ করা হয়নি বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের গবেষণায় সংসদ সদস্যদের আসনভিত্তিক স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য সুফল পাওয়া যায়নি। তার মতে, এসব প্রকল্পে জনগণের অর্থের অপব্যবহার, উন্নয়নের দলীয়করণ এবং স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীদের ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পুরোনো প্রকল্পগুলোর স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর কৌশল নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

অন্যদিকে এলজিইডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের আওতায় থাকা বিশাল গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণে রাজস্ব বাজেট থেকে পর্যাপ্ত অর্থ পাওয়া যায় না। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে সংস্কারের প্রয়োজন থাকা অবকাঠামোর প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ করা সম্ভব হবে বলে তাদের ভাষ্য।

তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, আগের প্রকল্পগুলোর অনিয়ম ও দুর্বলতা দূর না করে বরাদ্দ তিন গুণের বেশি বাড়ালে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার কতটা নিশ্চিত করা যাবে। বিশেষ করে সংসদ সদস্যদের চাহিদার ভিত্তিতে প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রয়োজনীয়তা যাচাই এবং কাজের মান নিশ্চিত করা না গেলে বড় অঙ্কের এই বরাদ্দও আগের প্রকল্পগুলোর মতো অনিয়মের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর