শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৭ অপরাহ্ন

বিশ্ব খাদ্য দিবস আজ

বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬/১০/২০২৬ ০৯:০০:১৫ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ


বাংলাদেশে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে এ ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে। বছরের শুরুর তুলনায় এ সংখ্যা ২৮ লাখ বেশি।

গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার পেছনে মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, বন্যায় কৃষির ক্ষতি, শিশুদের অপুষ্টি এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্যসহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০তম সম্মেলনে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ১৯৮১ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের মধ্যে এবার দিবসটি পালিত হচ্ছে। কয়েকটি জরিপেও দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের একটি অংশের মানুষ সব সময় খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকে। ডব্লিউএফপির প্রতিবেদন বলছে, সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যসংকট ও পুষ্টিহীনতা শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে বাধাগ্রস্ত করছে। পর্যাপ্ত খাবারের অভাব এবং খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান না থাকায় তাদের বৃদ্ধি ও বিকাশ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চার শিশুর একজন খর্বকায় অর্থাৎ বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম। এ ছাড়া ১১ শতাংশ শিশু ক্ষীণকায়, অর্থাৎ উচ্চতার তুলনায় তাদের ওজন কম। প্রতি পাঁচটি পরিবারের দুটিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অণুপুষ্টির ঘাটতিও রয়েছে।

ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় দেশের প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার কৃষক পরিবার এবং ১৩ লাখ মানুষ। এর প্রভাব পড়েছে খাদ্য উৎপাদন ও মানুষের জীবিকার ওপর।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে। দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তবে ওই অঞ্চল থেকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০২২ সালের শুরুর দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে খাদ্যের দাম বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা বিগত এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর কয়েক মাস খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। বর্তমানে তা ১০ শতাংশের নিচে নেমেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।

তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ বাজারে পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ, দাম বাড়ার হার আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত ১৩ অক্টোবর এক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, বাজারে বর্তমানে মোটা চালের কেজি কমপক্ষে ৫০ টাকা। খোলা আটার দামও একই।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় ৮ লাখ ৩৪ হাজার টন চাল ও গম বিতরণ করা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ পরিমাণ ৪৮ হাজার টন কম। তবে দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে, যা যথেষ্ট ভালো অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, খাদ্যসংকটের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের পরিবার, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, নারীপ্রধান পরিবার এবং দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের জন্য খাদ্যসহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি এবং লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তার পরিধি বাড়াতে হবে।

সেলিম রায়হান আরও বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও কারসাজি ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি এবং সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর