সাপ্তাহিক মজুরি না পেয়ে টানা কর্মবিরতি পালন করছেন শ্রমিকরা।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে দেউন্দি টি কোম্পানির অধীন তিনটি চা বাগানের শ্রমিকরা সাপ্তাহিক মজুরি না পেয়ে টানা কর্মবিরতি পালন করছেন। গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) থেকে শুরু করে আজ বুধবার নোয়াপাড়া, লালচাঁদ ও দেউন্দি চা বাগানের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিচ্ছেন না। বকেয়া মজুরি পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত কাজে ফিরতে রাজি নন তাঁরা।
শ্রমিক সূত্রে জানা যায়, প্রতি সপ্তাহের সোমবার তাঁদের মজুরি পাওয়ার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে টাকা না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয় শ্রমিকদের। এর প্রতিবাদে সোমবার থেকে তাঁরা কর্মবিরতি শুরু করেন। বুধবার পর্যন্ত এ কর্মসূচি অব্যাহত ছিল। একই সঙ্গে চা কারখানাগুলো বন্ধ রেখে শ্রমিকরা প্রতিদিন কর্মবিরতি পালন করছেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, দেউন্দি টি কোম্পানির অধীন চা বাগানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সংকট চলছে। এবার সাপ্তাহিক মজুরি না পাওয়ায় তাঁদের পরিবারগুলো আরও আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
লালচাঁদ চা বাগানের শ্রমিক সভাপতি বিজন বাউরী ও বাগান পঞ্চায়েত নেতা খেলু নায়েক বলেন, দেউন্দি টি কোম্পানির অধীন চারটি চা বাগানের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। মালিকপক্ষ নিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি দিতে পারছে না। অথচ সপ্তাহ শেষে মজুরি পাওয়ার পর সেই টাকা দিয়ে চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে সংসার চালাতে হয়।
তাঁরা বলেন, চা শ্রমিকদের অধিকাংশই স্বল্প মজুরিতে কোনো রকমে সংসার চালান। তাঁদের হাতে সঞ্চিত অর্থও থাকে না। সাপ্তাহিক মজুরি দিয়ে পরিবারের খাবার, সন্তানদের লেখাপড়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে হয়। নির্ধারিত সময়ে মজুরি না পাওয়ায় শ্রমিক পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
চা বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি কমেট নায়েক বলেন, দেউন্দি টি কোম্পানি কবে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করবে, সে বিষয়ে বাগান কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত তাঁদের কোনো সুস্পষ্ট উত্তর দিতে পারেনি। এতে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। বকেয়া মজুরি পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাঁরা কাজে ফিরবেন না।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি হবিগঞ্জ জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং শ্রীমঙ্গলের শ্রম অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে। তবে কর্মবিরতি কত দিন চলবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
দেউন্দি টি কোম্পানির আর্থিক সংকটের প্রভাব কয়েক বছর ধরে বাগানগুলোতে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একসময় দেশের অন্যতম পরিপাটি ও সুনামধন্য হিসেবে পরিচিত এই কোম্পানির অধীনে চারটি চা বাগান ছিল। এর মধ্যে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিঙ্গা চা বাগান এবং হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার লালচাঁদ ও দেউন্দি এবং মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া চা বাগান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, মঞ্জুর হওয়া ঋণ বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে না পাওয়ায় ২০২২ সাল থেকে কোম্পানিটি আর্থিক সংকটসহ নানা সমস্যায় পড়েছে। বিএনপি সরকারের আমলে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুর্শেদ খানের মালিকানাধীন এই কোম্পানির আর্থিক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের জীবনযাত্রায়।
বাগান কর্তৃপক্ষের দাবি, গত কয়েক বছর ধরে দেউন্দি টি কোম্পানি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছে না। এ নিয়ে একাধিক জাতীয় টেলিভিশন, জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক, আঞ্চলিক দৈনিক এবং বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কৃষি ব্যাংককে সুপারিশ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে তাঁদের অভিযোগ, এরপরও ঋণের বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।
আর্থিক সংকটের কারণে একসময় বাগানগুলোর গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। এতে চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। পরে নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে কারখানাগুলো আবার চালু করা হয়। এর মধ্যে বাগান থেকে কয়েকটি ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হয় কর্তৃপক্ষকে। এরপর শ্রমিকদের মজুরিসহ অন্যান্য পাওনা পরিশোধের চেষ্টা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
লালচাঁদ চা বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক হুমায়ুন আহমেদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ না পাওয়ায় অর্থসংকটের কারণে বাগানগুলোতে শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে চলমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে কোম্পানি।
তিনি আরও বলেন, দেউন্দি টি কোম্পানির অধীন চা বাগানগুলোকে প্রতি বছর লোকসান গুনতে হচ্ছে। চা উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে চায়ের বিক্রয়মূল্য বাড়েনি। এ অবস্থায় বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে বাগান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে সাপ্তাহিক মজুরি না পাওয়ায় শ্রমিকদের কর্মবিরতি অব্যাহত রয়েছে। তাঁদের দাবি, বকেয়া মজুরি পরিশোধ করা হলেই তাঁরা কাজে ফিরতে প্রস্তুত।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
সৈয়দ আখলাক উদ্দিন মনসুর (হবিগঞ্জ) শায়েস্তাগঞ্জ প্রতিনিধি 








