মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ন

৩৩৬ কোটি টাকার সিলেট হাই-টেক পার্কে পাঁচ বছরে কর্মসংস্থান মাত্র ৪০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০২/১১/২০২৬ ০৮:৫৫:৩৫ পূর্বাহ্ন

৩৩৬ কোটি টাকার সিলেট হাই-টেক পার্কে পাঁচ বছরে কর্মসংস্থান মাত্র ৪০০


২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান আর দেড় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল সিলেটের হাই-টেক পার্কের। পরিকল্পনা ছিল, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ ঘটবে, কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলবে তরুণদের সামনে, আর সিলেটের অর্থনীতি পাবে শিল্পায়নের নতুন গতি। কিন্তু ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেই পার্কে উদ্বোধনের প্রায় পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান রয়ে গেছে বিস্তর। এখন পর্যন্ত কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৪০০ মানুষের, বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। বরাদ্দ পাওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। যারা কাজ করছে, তারাও গ্যাসসংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাটসহ নানা অবকাঠামোগত সমস্যায় ধুঁকছে।

সিলেট নগরী থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ১৭১ দশমিক ০৭ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে ‘হাই-টেক পার্ক, সিলেট’। ২০১৬ সালের মার্চে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্ক’ নামে এর উদ্বোধন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পার্কটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘হাই-টেক পার্ক, সিলেট’।

প্রকল্পটির মাধ্যমে সিলেটের অর্থনীতিকে শিল্পায়িত করা, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য সেভেন সিস্টার্সের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা ছিল। সে লক্ষ্য সামনে রেখে পার্ক নির্মাণের সময় বিনিয়োগকারীদের জন্য গ্যাস সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ট্যাক্স হলিডে বা কর অবকাশ, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ এবং মুনাফা ও মূলধন নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত বছর পরও এসব সুবিধার প্রায় সবই বাস্তবায়নের বদলে প্রতিশ্রুতির পর্যায়েই রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের (বিএইচটিপিএ) তথ্য অনুযায়ী, পার্কটির প্রায় ৪৪ একর জমি এ পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখনও খালি পড়ে আছে ৭৬ একরের বেশি জমি। অন্যদিকে, প্রশাসনিক ভবনে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ২১ হাজার ৫৭৬ বর্গফুট স্পেসের মধ্যে ১৯ হাজার ৬২ বর্গফুট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেখানে জায়গা পাওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটিই এখনও কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।

জমি বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে র‍্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডই কেবল তাদের ৩২ একর জায়গায় অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করে ২০২৫ সাল থেকে উৎপাদনে গেছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি অবকাঠামো নির্মাণ করছে, তিনটি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেও নির্মাণকাজ স্থগিত রেখেছে এবং চারটি প্রতিষ্ঠান এখনও নির্মাণকাজ শুরু করেনি।

পার্কটির প্রধান বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান র‍্যাংগস ইলেকট্রনিক্স। অবকাঠামো নির্মাণ করে উৎপাদনে গেলেও প্রতিষ্ঠানটিকে বছরের পর বছর ধরে গ্যাস ও বিদ্যুৎসংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

র‍্যাংগসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিল্পকারখানার জন্য গ্যাস সংযোগ পেতে প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে আবেদন করে। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। পরে ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিএইচটিপিএ প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে আবার আবেদন করলেও সেটিও নাকচ হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে কর্তৃপক্ষ নতুন করে আবেদন করেছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

পার্ক এলাকায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড পরিচালিত ৩৩/১১ কেভি লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সিলেটে ভারী বর্ষণের সময় প্রায়ই দীর্ঘক্ষণ লোডশেডিং হয়। বিকল্প বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় এ সময় পার্কের সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

র‍্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে সবচেয়ে বড় বাধা হলো গ্যাস সংযোগ। আমাদের টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার এবং অন্যান্য উৎপাদন চালুর পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু আমরা শুধু রেফ্রিজারেটর তৈরি করছি। বাড়তি উৎপাদন খরচের পাশাপাশি আমাদের বছরে ৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।’

তিনি জানান, নিজেদের জমিতে কারখানা নির্মাণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রেখে তারা এখানে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন সহজে পাওয়ার জন্য শুরু থেকেই ওয়ান-স্টপ সার্ভিস দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই সুবিধা তারা পাননি। তাদের অন্যান্য প্রকল্পের মতোই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয়েছে।

প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, নির্মাণকাজের প্রথম তিন বছর কোনো ভাড়া নেওয়ার কথা ছিল না। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান লাভ-ক্ষতির সমতা বা ‘ব্রেক-ইভেন পয়েন্টে’ পৌঁছানো পর্যন্ত ভাড়া যৌক্তিক রাখার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু শুরু থেকেই ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তার অভিযোগ, পার্কে বিদ্যুতের কোনো বিকল্প সংযোগ নেই। রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চললে দিনের পর দিন উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা গ্যাস সংযোগ। নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে বারবার আবেদন করেও সাড়া মেলেনি।

রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনারসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের লাইন চালুর পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে তারা মাত্র ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় শুধু রেফ্রিজারেটর তৈরি করছেন। এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং বছরে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

পার্কে বর্তমানে কার্যক্রম পরিচালনাকারী অন্য প্রতিষ্ঠান ‘আপস্কিল বাংলাদেশ’। প্রতিষ্ঠানটিও যোগাযোগ, যাতায়াত ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির লিড এইচআর মুমিনুর রহমান তমাল জানান, নিউইয়র্কভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি উন্নত আইটি কোর্স দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছিল।

তিনি বলেন, ‘যোগাযোগ ও যাতায়াত সমস্যার কারণে আমরা শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে এবং কর্মীদের ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছি। এ ছাড়া সন্ধ্যার পর চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে।’

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসার পর হাই-টেক পার্কটি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করে বর্তমান প্রশাসন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গত জুনে পার্কটি পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি পার্কটির বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তখন তিনি জানান, মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনার পর এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে সরকার। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো ফলাফলের কথা জানা যায়নি।

বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুর রহমান মনে করেন, সিলেট শহর থেকে পার্কটির দূরত্ব এবং গ্যাস সংযোগের অভাব নতুন বিনিয়োগকারী আকর্ষণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, এসব সমস্যার কারণে কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে কর্তৃপক্ষ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

মো. ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সচিব সম্প্রতি সিলেটের স্থানীয় ব্যবসায়ী চেম্বার নেতাদের নিয়ে পার্কটি পরিদর্শন করেছেন এবং আমরা আশা করছি সব সমস্যা কাটিয়ে নতুন বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে কাজ করব। আগামী ৪ নভেম্বর আমাদের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে, যেখানে পার্কসংক্রান্ত সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে। সব বাধা অতিক্রম করে হাই-টেক পার্কটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই পার্ককে ঘিরে একসময় যে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, পাঁচ বছর পরও তার বড় অংশ অধরা। ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এবং দেড় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের লক্ষ্যের বিপরীতে এখন পর্যন্ত কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৪০০ জনের, বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। জমি ও জায়গা বরাদ্দ পেয়েও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু না হওয়া, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং যোগাযোগ ও নিরাপত্তার সমস্যাগুলো পার্কটির সম্ভাবনাকে সীমিত করে রেখেছে। এখন প্রশ্ন, প্রতিশ্রুত সুবিধা বাস্তবায়ন এবং বিদ্যমান বাধা দূর করে সিলেটের এই হাই-টেক পার্ককে কবে সত্যিকার অর্থে কার্যকর বিনিয়োগকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব হবে?

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর