টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় ন্যাচার স্টাডি, নিরাপত্তা ক্যাম্প ও মাছের চলাচলের পথ সংরক্ষণের দাবি
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১২ PM

টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় ন্যাচার স্টাডি, নিরাপত্তা ক্যাম্প ও মাছের চলাচলের পথ সংরক্ষণের দাবি

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২/০৯/২০২৬ ০৩:১৮:১৮ PM

টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় ন্যাচার স্টাডি, নিরাপত্তা ক্যাম্প ও মাছের চলাচলের পথ সংরক্ষণের দাবি


টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় স্কুল পর্যায়ে ‘ন্যাচার স্টাডি’ চালু, পুরোনো চারটি নিরাপত্তা ক্যাম্প পুনরায় চালু এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে মাছের দীর্ঘ মাইগ্রেশন রুট সংরক্ষণ, দ্রুতগতির নৌযানের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং হাওরের নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কর্মশালায় অংশ নেওয়া বক্তারা।

শুক্রবার সকাল ১০টায় সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসের সভাকক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তর বাস্তবায়নাধীন ‘টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি বাস্তুতন্ত্রের সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের আওতায় ‘জলাভূমি সম্পদের সঠিক ব্যবহার’ বিষয়ক মতবিনিময় কর্মশালায় এসব প্রস্তাব ও দাবি উঠে আসে।

কর্মশালায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম, প্রকল্প পরিচালক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহেদা বেগম, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানসহ সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় অংশীজন ও অন্যান্য বক্তারা উপস্থিত ছিলেন।

হাওর রক্ষায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান। তিনি উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে ‘ন্যাচার স্টাডি ক্লাব’ চালুর পাশাপাশি হাওরভিত্তিক বিশেষ কারিকুলাম প্রণয়নের প্রস্তাব দেন।

তার প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব পাঠ্যক্রমে টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে হাওরের সম্পর্ক তুলে ধরা যেতে পারে।

থাইল্যান্ডের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ এলাকার স্কুলগুলোতে স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে বিশেষ বিষয় পড়ানো হয় এবং তা পরীক্ষার অংশও। এ ধরনের শিক্ষা শিক্ষার্থীদের নিজেদের এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় আগ্রহী করে তুলতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

টাঙ্গুয়ার হাওরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও কর্মশালায় আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, অতীতে হাওরের ইজারাদার ব্যবস্থায় প্রায় সাড়ে চারশ পাহারাদার থাকলেও বর্তমানে বিশাল এলাকায় ১৫, ২০ বা ২৫ জন আনসার সদস্য এবং কয়েক দিনের জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

প্রথমআলোর নিজস্ব প্রতিবেদক খলিল রহমান হাওরের পুরোনো চারটি নিরাপত্তা ক্যাম্প পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব দেন। তার মতে, শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো ছাড়া নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, অবৈধ মাছ শিকার এবং অন্যান্য পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

আনসার ও ভিডিপি’র জেলা কমান্ড্যান্ট মোরশেদা খানম জানান, জেলা প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী আনসার সদস্যরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও যৌথ অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। নিষিদ্ধ জাল ধ্বংস, জরিমানা এবং হাউজবোটসহ বিভিন্ন অভিযানে তাদের ভূমিকা রয়েছে।

তবে হাওরে দায়িত্ব পালনকারী আনসার সদস্যদের আবাসন ও সুযোগ-সুবিধা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। কোথাও দরজা-জানালাবিহীন অবস্থায় তাদের থাকতে হয় এবং রান্নার জ্বালানির সংকট রয়েছে বলে জানান মোরশেদা খানম। কয়েক মাস ধরে বেতন না পাওয়ার অভিযোগও তিনি তুলে ধরে নিয়মিত বেতন ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।

টাঙ্গুয়ার হাওরের মাছের দীর্ঘ মাইগ্রেশন রুট সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেন বক্তারা।

সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাব সভাপতি পঙ্কজ কান্তি দে টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘মাদার ফিশারি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, হাওরের মাছ বিভিন্ন নদীপথ ধরে ভাটি অঞ্চলের বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে শুধু হাওরের ভেতরের কয়েক কিলোমিটার নয়, বৃহত্তর নদীপথের সঙ্গে মাছের চলাচলের সম্পর্কও বিবেচনায় নিতে হবে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, সিল্টেশনের কারণে নদীপথের গভীরতা কমে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে ভৈরব হয়ে আরও দূরের নদী এবং ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত মাছের চলাচলের পথ উন্মুক্ত রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

হাওরের নীরব পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্রুতগতির নৌযান নিয়ন্ত্রণের দাবিও ওঠে কর্মশালায়। বক্তারা বলেন, পরিবেশগত ভারসাম্যের কথা বিবেচনা করে সব নৌযানকে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে।

তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কিংবা সাধারণ পর্যটক কেউই নিয়মের বাইরে থাকতে পারেন না। হাওরের জন্য নির্ধারিত বিধিনিষেধ সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর করা জরুরি।

বক্তারা বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। এর সঙ্গে শিক্ষা, কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, মাছের চলাচলের পথ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সমন্বিতভাবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমির জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ, জেলা বন রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রিয়াজ উদ্দিন, নির্বাহী প্রকৌশলী এলজিইডি, মো. আনোয়ার হোসেন, জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক, জেলা আনসার বিডিপি কমান্ড্যান্ট মোরশেদা খানম, প্রাক্তন অধ্যক্ষ শেরগুল আহমেদ, সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাব সভাপতি পঙ্কজ কান্তি দে, প্রথমআলোর নিজস্ব প্রতিবেদক খলিল রহমান, এনটিভির স্টাফ রিপোর্টার দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী প্রমুখ।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর