শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, সবুজ চা-বাগানের ঢেউখেলানো সৌন্দর্য, পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝরনার কলতান আর হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি প্রকৃতির এমন অপরূপ সাজে পর্যটকদের হাতছানি দিচ্ছে মৌলভীবাজার। দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিতে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কয়েকটি দিন কাটাতে এ জেলায় বাড়ছে পর্যটকদের আগ্রহ। তাঁদের বরণ করে নিতে প্রস্তুত হচ্ছে জেলার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলো। কোথাও আগাম বুকিং পৌঁছেছে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশে, আবার কোথাও সব কক্ষই আগেভাগে পূর্ণ হয়েছে।
প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে উৎসবের আমেজ মিলে মৌলভীবাজারে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক আবহ। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সবুজ অরণ্য, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের জলধারা, হাকালুকি হাওরের বিস্তৃতি, হামহাম ঝরনার পাহাড়ি সৌন্দর্য আর দিগন্তজোড়া চা-বাগান সব মিলিয়ে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এ জেলা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মণিপুরি সম্প্রদায়ের বর্ণিল সংস্কৃতি, নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ। পর্যটকদের সম্ভাব্য এই আগমন ঘিরে আশাবাদী স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরাও।
কমলগঞ্জের টিলাগাঁও ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপক সোহেল আহমেদ বলেন, ‘পূজার দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে আমাদের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে।’
শ্রীমঙ্গলের বালিসিরা কটেজের মালিক ও রাধানগর পর্যটন কল্যাণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সামছুল হক জানান, তাঁদের কটেজের সব কক্ষই আগাম বুকিং হয়েছে। শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি মো. সেলিম আহমদের ভাষ্য, উৎসবের সময়ে হোটেল-রিসোর্টে সাধারণত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং থাকে। পর্যটনশিল্পের এই সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করতে সরকারি উদ্যোগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মৌলভীবাজারের পর্যটন শুধু পাহাড়, বন কিংবা জলপ্রপাতের সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। কমলগঞ্জের ভানুবিল মাঝের গাঁওয়ের মণিপুরি কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র ‘মাঙাল ময়ুম’ সেই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরই এক পরিচিতি তুলে ধরছে।
কেন্দ্রটির উদ্যোক্তা নিরঞ্জন সিংহ বলেন, ‘পর্যটকেরা এখানে মণিপুরি নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সঙ্গে পরিচিত হন। এতে একদিকে মণিপুরি সংস্কৃতি পরিচিতি পাচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।’
তবে সম্ভাবনার এই পথে বাধা হয়ে আছে সড়ক ও রেল যোগাযোগের দুরবস্থা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পর্যটনের আকর্ষণ থাকলেও যাতায়াতব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ভ্রমণকে অনেক সময় কঠিন করে তোলে। ট্যুর গাইড অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাসেল আলম সিলেট-ঢাকা রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোসহ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন।
প্রকৃতির টানে আসা পর্যটকদের ভ্রমণ যেন নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হয়, সে প্রস্তুতিও নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শ্রীমঙ্গল জোনের ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ পরিদর্শক মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে টহল ও হেল্পডেস্ক থাকবে।’
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম জানান, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগমন ও পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধে পূজার আগে, চলাকালে ও প্রতিমা বিসর্জনের সময় সতর্ক নজরদারি থাকবে।
শরতের স্নিগ্ধতা, প্রকৃতির অপরূপ রূপ আর উৎসবের আনন্দ সব মিলিয়ে পূজার ছুটিতে পর্যটকদের জন্য নতুন করে সাজছে মৌলভীবাজার। পাহাড়, বন, হাওর আর সংস্কৃতির মেলবন্ধনে জেলাটি হয়ে উঠতে চাইছে এমন এক গন্তব্য, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি চেনা যায় স্থানীয় মানুষের জীবন ও ঐতিহ্যকেও।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি 








