উৎপাদনে এগিয়ে দেশের চা বাগান, বাড়তি ব্যয়ে শঙ্কায় মালিকরা
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৭ AM

উৎপাদনে এগিয়ে দেশের চা বাগান, বাড়তি ব্যয়ে শঙ্কায় মালিকরা

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২০/০৯/২০২৬ ০৭:২৯:২৮ AM

উৎপাদনে এগিয়ে দেশের চা বাগান, বাড়তি ব্যয়ে শঙ্কায় মালিকরা


অনুকূল আবহাওয়া ও আগাম বৃষ্টিপাতে চলতি মৌসুমে দেশের চা বাগানগুলোতে কচি পাতার ফলন বেড়েছে। জুলাই পর্যন্ত দেশে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৪১ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৮ লাখ ৩৩ হাজার কেজি বেশি। উৎপাদনের এই গতি ধরে রাখতে পারলে ২০২৬ সালের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে উৎপাদন বাড়লেও বিদ্যুৎ, সার, তেল ও গ্যাসসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং সেই তুলনায় নিলামে চায়ের দাম না বাড়ায় উদ্বেগে রয়েছেন বাগান মালিকরা।

আগাম বৃষ্টিপাত ও অনুকূল আবহাওয়ার প্রভাবে দেশের ১৭৩টি চা বাগানের পাশাপাশি মৌলভীবাজারের ৯২টি বাগানেও এখন সবুজ পাতার সমারোহ। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব বাগানে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকেরা। কেউ বাগান থেকে কচি পাতা সংগ্রহ করছেন, আবার কেউ কারখানায় সেই পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে ব্যস্ত। নির্ধারিত সময়ে সর্দারের ডাকে ওজন দেওয়ার জন্যও চা-চয়নকারীদের ছুটতে দেখা যাচ্ছে।

বার পাতার ফলন ভালো হওয়ায় শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা বেড়েছে। নির্ধারিত পরিমাণের বাইরে অনেক শ্রমিক ৪০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত কাঁচা পাতা সংগ্রহ করতে পারছেন। এতে নিয়মিত হাজিরার পাশাপাশি তাঁদের বাড়তি আয়ও হচ্ছে।

চা শ্রমিক বিনা বাউরী, স্বপ্না দোসাদ ও স্বপ্না মুন্ডা জানান, আগাম বৃষ্টির কারণে মৌসুমের শুরু থেকেই বাগানে ভালো পাতা এসেছে। প্রতিদিনের নির্ধারিত পরিমাণের পরও তাঁরা ৭০ থেকে ৮০ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত পাতা তুলতে পারছেন। বাগানভেদে অতিরিক্ত প্রতি কেজি কাঁচা পাতার জন্য চার থেকে পাঁচ টাকা করে পাওয়া যায়। বাড়তি এই আয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট।

ফলন বাড়ায় বাগান মালিকদের মধ্যেও লাভের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে চা বাগানগুলোতে স্বস্তি ও আশাবাদের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি। জুলাই পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৪১ হাজার কেজি। ২০২৫ সালের একই সময়ে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৮ হাজার কেজি। এক বছরের ব্যবধানে তাই উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ লাখ ৩৩ হাজার কেজি।

এর আগে ২০২৫ সালে ১০ কোটি ৩০ লাখ কেজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বছর শেষে উৎপাদন দাঁড়ায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ ২৭ হাজার কেজিতে। ২০২৪ সালে ১০ কোটি ৮০ লাখ কেজির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে দেশে ৯ কোটি ৩০ লাখ ৪২ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছিল।

উৎপাদনের পাশাপাশি নিলামেও চায়ের বিক্রির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে ৩ কোটি ২৭ লাখ ৮১৩ কেজি চা বিক্রি হয়েছে। সেখানে গড় মূল্য ছিল কেজিপ্রতি ২৭৫ টাকা। একই সময়ে শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্রে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ২১৩ কেজি চা বিক্রি হয়, যার গড় মূল্য ২৬০ টাকা। পঞ্চগড় নিলাম কেন্দ্রে বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কেজি চা, গড় মূল্য ছিল প্রায় ২৫২ টাকা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সব মিলিয়ে চা বিক্রি হয়েছে ৯ কোটি ৬ লাখ ৭২ হাজার কেজি। ওই সময়ে গড় মূল্য ছিল কেজিপ্রতি ২৪৫ টাকা।

চা রপ্তানিতেও সাম্প্রতিক সময়ে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা রপ্তানি করে ৩৬ কোটি ১০ লাখ টাকা আয় হয়েছিল। পরের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে ১৯ লাখ ৮০ হাজার কেজিতে দাঁড়ায় এবং আয় হয় ৪৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬ লাখ ৮০ হাজার কেজি চা রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৫ লাখ ৯০ হাজার কেজি চা রপ্তানি হয়েছে, যার বিপরীতে আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। তবে উৎপাদন ও বিক্রির এই ঊর্ধ্বমুখী ধারার মধ্যেই চা শিল্পের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে উৎপাদন ব্যয়। বাগান মালিকদের দাবি, বিদ্যুৎ, সার, তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে লোডশেডিংয়ের কারণে খরচ অনেক বেড়েছে। কিন্তু নিলামে চায়ের দাম সেই হারে বাড়েনি।

বাংলাদেশীয় চা সংসদ, ধলই ব্রাঞ্চের চেয়ারম্যান ও পাত্রখলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক ইউসুফ খান বলেন, উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় তাঁরা পর্যাপ্ত দাম পাচ্ছেন না। বিদ্যুৎ, সার, তেল ও গ্যাসের বাড়তি খরচ এবং লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু প্রকৃত খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিলামে চায়ের দাম না পাওয়ায় বাগান মালিকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

শ্রমিক নেতারাও বলছেন, উৎপাদন ও বিক্রি বাড়লেও এর সুফল শ্রমিকদের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে, সে বিষয়ে তাঁদের কাছে পরিষ্কার তথ্য নেই।

শমসেরনগর চা বাগান পঞ্চায়েত নেতা গোপাল কানুর অভিযোগ, বাগানের লাভের হিসাব শ্রমিকদের জানানো হয় না। অনেক শ্রমিকের বকেয়া পাওনা রয়েছে এবং বেশ কিছু বাগান বন্ধও রয়েছে। তাঁর দাবি, নিলামে তুলনামূলক ভালো দামে চা বিক্রি হলে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধের পাশাপাশি বন্ধ বাগানগুলোও খুলে দেওয়া উচিত।

চা শ্রমিক সর্দার লক্ষন মাদ্রাজী, শ্যামল ভৌমিক ও আব্দুল আহাদ জানান, বর্তমানে বাগানে পাতা ভালো হওয়ায় শ্রমিকেরা প্রতিদিন নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি পাতা সংগ্রহ করতে পারছেন। এতে তাঁদের বাড়তি আয় হচ্ছে। তবে তাঁদের অন্যান্য ন্যায্য পাওনাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর