সিলেটের জকিগঞ্জে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে সাজিদ রাজার বাড়ি। প্রায় ১৫ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা একসময়ের ঐশ্বর্যশালী এই জমিদারবাড়ির স্থাপনাগুলো এখন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক বাড়িটিকে ঘিরে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি।
জকিগঞ্জ উপজেলার কাজলসার ইউনিয়নের চারিগ্রাম মৌজায় অবস্থিত এই বাড়িটি স্থানীয় ইতিহাস, লোককথা ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই জনপদের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন স্থাপনাগুলোর মধ্যে সাজিদ রাজার বাড়িও অন্যতম।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে ধর্মপ্রাণ জমিদার সাজিদ রাজা প্রায় ১৫ একর জমির ওপর এই প্রাসাদসম বাড়ি নির্মাণ করেন। সময়ের সঙ্গে এর অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ এখনো অতীতের সেই সময়ের স্মৃতি বহন করছে।
বাড়িটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থাপনা ১৩ চালার বিশাল টিনের ঘর। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন কলকাতা থেকে আনা দক্ষ কারিগররা ১৩ হাজার টাকা মজুরিতে এটি নির্মাণ করেছিলেন। সে সময় ভবনটি বিচারালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এর নির্মাণশৈলী এখনো দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
বাড়ির পাশেই রয়েছে প্রায় সাত একর আয়তনের একটি বড় পুকুর। পুকুরের পাড়ে রয়েছে ১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত পিলার ও গম্বুজশোভিত একটি মসজিদ। এর পাশাপাশি আছে প্রায় ২৭০ বছরের পুরোনো রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। এসব স্থাপনা মিলিয়ে জায়গাটি অতীতের ঐশ্বর্যের একটি চিত্র তুলে ধরে।
সাজিদ রাজাকে ঘিরেও স্থানীয়ভাবে নানা ইতিহাস ও কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, তিনি জৈন্তিয়া রাজপরিবার থেকে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন ইছন রাজা। স্থানীয়দের মধ্যে আরও প্রচলিত রয়েছে, হাসন রাজাসহ জৈন্তিয়া ও মোগল আমলের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই বাড়িতে যাতায়াত করতেন।
তবে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে সময়ের সঙ্গে এই নিদর্শনগুলোর আরও ক্ষতি হবে।
সাজিদ রাজার বাড়িতে যাতায়াতও তুলনামূলক সহজ। সিলেট নগরী থেকে জকিগঞ্জগামী বাসে আটগ্রাম স্ট্যান্ডে নেমে রিকশায় কিংবা ১০ থেকে ১৫ মিনিট হেঁটে সেখানে যাওয়া যায়। জকিগঞ্জ সদর থেকেও বাস বা সিএনজি অটোরিকশায় একই পথে যাতায়াত করা সম্ভব।
স্থানীয়দের দাবি, ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে সাজিদ রাজার বাড়ি দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। তাদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও প্রচারের মাধ্যমে এই প্রাচীন স্থাপনাকে দেশের পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরা সম্ভব।
ইতিহাসের এমন নিদর্শন শুধু একটি এলাকার অতীতের স্মৃতি নয়; এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য। তাই সাজিদ রাজার বাড়ি সংরক্ষণকে স্থানীয় ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের অংশ হিসেবে দেখার দাবি উঠেছে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
জকিগঞ্জ প্রতিনিধি 








