১৭ কার্যদিবসে বিচার শেষ, চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষা প্রায় ৯ বছর
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৯ PM

রাজন হত্যা

১৭ কার্যদিবসে বিচার শেষ, চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষা প্রায় ৯ বছর

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩/০৯/২০২৬ ০১:৩৭:১৮ PM

১৭ কার্যদিবসে বিচার শেষ, চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষা প্রায় ৯ বছর


একটি শিশুর জীবনের শেষ কয়েকটি মুহূর্ত খুঁটির সঙ্গে বাঁধা, নির্মম নির্যাতন, তারপর নিথর হয়ে যাওয়া। সেই দৃশ্য মুঠোফোনের ক্যামেরায় বন্দী হয়েছিল। ২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চুরির অভিযোগ তুলে শিশু শেখ সামিউল আলম রাজনকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীদের একজন সেই নির্যাতনের দৃশ্য ধারণ করেন। পরে ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়ে দেশ। শুরু হয় প্রতিবাদ, ওঠে বিচার দাবির আওয়াজ।

রাজন হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচার শুরুর পর গতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মাত্র ১৭ কার্যদিবসে বিচারিক আদালতে বিচার শেষ হয়। হত্যাকাণ্ডের চার মাসের মধ্যেই দেওয়া হয় রায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই গতি যেন থেমে যায়। ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল হাইকোর্ট চার আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল করার পর মামলাটি যায় আপিল বিভাগে। এরপর প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

যে মামলার বিচারিক আদালতের বিচার শেষ হয়েছিল মাত্র ১৭ কার্যদিবসে, সেই মামলার শেষ ধাপের জন্যই এখন অপেক্ষা করতে হচ্ছে প্রায় এক দশক।

রাজন সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী (বাদেয়ালি) গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি এলাকায় তাঁকে চুরির অভিযোগে আটক করা হয়। ২০১৫ সালের ৮ জুলাই খুঁটির সঙ্গে বেঁধে তাঁকে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে তিনি মারা যান।

সেই নির্মমতার দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করা হয়েছিল। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর রাজন হত্যা আর শুধু একটি পরিবারের শোক হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছিল সারা দেশের আলোচিত ঘটনা। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যার বিচার দাবিতে প্রতিবাদ হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে। ২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট ১৩ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এরপর সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলার বিচার শুরু হয়।

অবশেষে ওই বছরের ৮ নভেম্বর আসে রায়। মাত্র ১৭ কার্যদিবসে বিচার শেষ করে আদালত চার আসামি কামরুল ইসলাম, ময়না চৌকিদার, তাজউদ্দিন আহমদ বাদল ও পলাতক জাকির হোসেন পাভেল আহমদকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

কামরুলের সহযোগী নূর মিয়াকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কামরুলের তিন ভাই মুহিত আলম, আলী হায়দার ও শামীম আহমদকে সাত বছর করে এবং দুলাল আহমদ ও আয়াজ আলীকে এক বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রে ১৩ জন আসামি থাকলেও বিচারিক আদালতে ১০ জনের সাজা হয় এবং তিনজন খালাস পান।

বিচারিক আদালতের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স যায় হাইকোর্টে। কয়েকজন আসামিও আপিল করেন। ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি হাইকোর্টে এসবের শুনানি শুরু হয়। ১৯ কার্যদিবসে শুনানি শেষ হওয়ার পর ১১ এপ্রিল রায়ের দিন ধার্য করা হয়।

সেদিন বিচারিক আদালতের দেওয়া চার আসামির মৃত্যুদণ্ডই বহাল রাখেন হাইকোর্ট। তিন আসামির সাত বছর করে এবং দুই আসামির এক বছর করে কারাদণ্ডও বহাল থাকে। তবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া নূর মিয়ার সাজা কমিয়ে ছয় মাস করা হয়।

হাইকোর্টের ওই রায়ের পর রাজনের বাবা শেখ মো. আজিজুর রহমান আলম বলেছিলেন, তিনি রায়ে সন্তুষ্ট। দ্রুত আসামিদের দণ্ড কার্যকর দেখতে চান। কিন্তু সেই প্রত্যাশার পর মামলাটি চলে যায় আপিল বিভাগে।

হাইকোর্টের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের পক্ষ থেকে আপিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মামলাটি যায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। ২০১৭ সালের রায়ের পর ২০২২ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পাঁচ বছরেও আপিল বিভাগে মামলাটির চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরাও তখন মামলাটি শুনানির অপেক্ষায় থাকার কথা জানিয়েছিলেন। তারপর পেরিয়েছে আরও কয়েকটি বছর।

২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে রাজন হত্যা মামলাকে প্রায় নয় বছর ধরে আপিল বিভাগে ঝুলে থাকা মামলাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই প্রতিবেদনে খুলনার শিশু রাকিব হত্যা মামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।

রাজন হত্যার পর মামলার অন্যতম প্রধান আসামি কামরুল ইসলাম সৌদি আরবে পালিয়ে যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নির্যাতনের ভিডিও দেখে তাকে শনাক্ত করা হয়। পরে প্রবাসীদের সহযোগিতায় সৌদি আরব থেকে তাকে আটক করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুত এগোয়।

তবে শুরুতেই পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। রাজনের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা গ্রহণে বিলম্ব, পরিবারের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং প্রধান আসামি কামরুল ইসলামকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছিল।

এসব অভিযোগের পর জালালাবাদ থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) আখতার হোসেন, এসআই জাকির হোসেন ও এসআই আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

রাজন হত্যার পর থেকেই তার মা লুবনা আক্তার ছেলের হত্যার বিচার দাবি করে আসছেন। হত্যাকাণ্ডের পর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার পুয়া (ছেলে) চোর না। এ কথা সারা এলাকার মানুষ জানে। আমি ছেলে হত্যার উচিত বিচার চাই।’ বছর পেরিয়েছে। রায় এসেছে। কিন্তু অপেক্ষার শেষ হয়নি।

লুবনা আক্তার বলেন, রাজনকে হারানোর কষ্ট কোনো দিন শেষ হবে না। এত বছর হয়ে গেলেও তিনি ছেলেকে ভুলতে পারেননি। বিচার হয়েছে, কিন্তু মামলাটি এখনো শেষ হয়নি।

তিনি বলেন, ‘রাজনকে হারানোর কষ্ট কোনো দিন শেষ হবে না। এত বছর হয়ে গেলেও ভুলতে পারিনি। বিচার হয়েছে, কিন্তু মামলাটি এখনো শেষ হয়নি। যারা আমার ছেলেকে মেরেছে, তাদের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দ্রুত হোক। আর কোনো মায়ের সন্তান যেন এভাবে নির্যাতনের শিকার না হয়।’

রাজনের বাবা শেখ মো. আজিজুর রহমান আলমও দ্রুত মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি চান।

তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিনিয়ত হাইকোর্টে যাই, কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথার উত্তর দিচ্ছে না। আমি চাই, আমার ছেলে হত্যার যে রায় হয়েছে, সেটা দ্রুত কার্যকর করা হোক।’

এ ব্যাপারে সিলেট কেন্দ্রীয় জেল সুপার মো. নাসির উদ্দিন প্রধান বলেন, রাজন হত্যা মামলার আসামিদের বর্তমান অবস্থার বিষয়ে তিনি অবগত নন। ঘটনাটি পুরোনো হওয়ায় বিস্তারিত তথ্য পেতে কিছুটা সময় লাগবে বলে জানান তিনি।

রাজনের মৃত্যুর পর কেটে গেছে ১১ বছর। সেই ১৭ কার্যদিবসের বিচার আজও পরিবারের অপেক্ষার কাছে দীর্ঘ হয়ে আছে। একটি শিশুকে হারানোর শোকের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রতীক্ষা যে প্রতীক্ষার শেষ এখনো দেখেনি রাজনের পরিবার।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর