প্রতিশ্রুতির আলো নিভে গেছে, থমকে আছে সিলেটের ‘ওয়াইফাই সিটি’
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৮ PM

প্রতিশ্রুতির আলো নিভে গেছে, থমকে আছে সিলেটের ‘ওয়াইফাই সিটি’

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৭/০৯/২০২৬ ০৯:৪৮:০৩ AM

প্রতিশ্রুতির আলো নিভে গেছে, থমকে আছে সিলেটের ‘ওয়াইফাই সিটি’


পাহাড়, টিলা, নদী আর সবুজের মায়ায় ঘেরা সিলেট। প্রকৃতির সৌন্দর্যে অনন্য এই নগরকে প্রযুক্তির আধুনিকতায়ও এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল। শহরের পথ থেকে জনসমাগমের স্থান সবখানে ছড়িয়ে পড়বে ইন্টারনেটের অবাধ সংযোগ, প্রযুক্তির আলোয় বদলে যাবে নগরজীবন। সেই স্বপ্ন থেকেই প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেটকে দেশের প্রথম ‘ওয়াইফাই সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

নগরের ৬৫টি এলাকার ১২৬টি পয়েন্টে বসানো হয়েছিল ওয়াইফাইয়ের যন্ত্রপাতি। পরিকল্পনা ছিল, নগরের মানুষের হাতের নাগালে থাকবে বিনা মূল্যের উচ্চগতির ইন্টারনেট। কিন্তু যাত্রার দেড় বছরের মধ্যেই থেমে গেছে সেই উদ্যোগ। এখন নগরের বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা ওয়াইফাইয়ের যন্ত্রপাতিগুলো যেন সেই অপূর্ণ স্বপ্নের নীরব সাক্ষী।

দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যে উদ্যোগ একসময় প্রযুক্তিনির্ভর সিলেটের নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছিল, সেটিই এখন কার্যত বন্ধ। আর প্রকল্পটি কেন থেমে গেল, সেই প্রশ্নে সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) এখন পরস্পরের দিকে দায় ঠেলছে।

সিসিকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনার কাঠামো নিশ্চিত না করেই প্রকল্পটি তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তবে বিসিসির বক্তব্য ভিন্ন। সংস্থাটির দাবি, কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে যথাযথ নিয়ম মেনেই প্রকল্পটি সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

২০২০ সালের এপ্রিলে সিলেটকে দেশের প্রথম ‘ওয়াইফাই সিটি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন নগরের ৬৫টি এলাকার ১২৬টি পয়েন্টে বিনা মূল্যে ওয়াইফাই সেবা চালু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি পয়েন্টে একই সময়ে ৫০০ জন ব্যবহারকারীকে উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পের প্রথম বছর ইন্টারনেট সেবার ব্যয় বহন করে বিসিসি। পরে প্রকল্পটি হস্তান্তর করা হয় সিলেট সিটি ককর্পোরেশনের কাছে।

সিসিকসূত্রে জানা যায়, হস্তান্তরের পরও প্রায় ছয় মাস সেবা চালু ছিল। এরপর একসময় বন্ধ হয়ে যায় সংযোগ।

সিসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়দেব বিশ্বাস বলেন, প্রকল্পটি চালু রাখার মতো প্রয়োজনীয় বরাদ্দের সুযোগ না থাকায় এটি এখন অনেকটা বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। নগরের বিভিন্ন পয়েন্টে খুঁটির সঙ্গে স্থাপন করা কিছু যন্ত্রপাতি এখনো আছে। তবে ব্যান্ডউইথ না থাকায় নগরবাসী আর সেই সেবা পাচ্ছেন না। তাঁর ভাষ্য, ওয়াইফাই প্রকল্পটি ব্যয়বহুল এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বেশি।

সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, প্রকল্পের সার্ভারে সিটি কর্পোরেশনকে কখনোই অ্যাকসেস দেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, শুধু অবকাঠামো হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং প্রতি মাসের ইন্টারনেট বিল পরিশোধের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের ওপর দেওয়া হয়।

তবে সিসিকের এই অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় বিসিসি। সংস্থাটির সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট মধুসুদন দত্ত বলেন, প্রকল্পটি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই হস্তান্তর করা হয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত নথিপত্রও রয়েছে। হস্তান্তরের পর প্রকল্পটি চালু রাখা হবে কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মধুসুদন দত্ত আরও বলেন, প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের চেয়েও বেশি সময় বিসিসির পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। তবে অতিরিক্ত সময়ের জন্য সিটি করপোরেশনের কাছে কোনো অর্থ দাবি করা হয়নি।

‘ওয়াইফাই সিটি’ প্রকল্পের স্বপ্ন ছিল আরও বিস্তৃত। এটি শুধু নগরবাসীকে বিনা মূল্যে ইন্টারনেট দেওয়ার উদ্যোগ ছিল না; প্রযুক্তির সঙ্গে নগরজীবনের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা এবং সিলেটকে একটি প্রযুক্তিনির্ভর ও স্মার্ট নগর হিসেবে গড়ে তোলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশও ছিল এটি।

কিন্তু সেই পরিকল্পনার পথেই এখন জমেছে স্থবিরতা। নগরের বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা ওয়াইফাইয়ের যন্ত্রপাতিগুলো যেন নীরবে বলে যাচ্ছে এক অপূর্ণ গল্প স্বপ্ন ছিল প্রযুক্তির সংযোগে বদলে যাবে নগরজীবন, অথচ সমন্বয়, অর্থায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই সংযোগই আজ বিচ্ছিন্ন।

এ অবস্থায় দুই পক্ষের সমন্বয়হীনতা দূর করে যথাযথ পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে প্রকল্পটি আবার চালু করার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. সাইদুর রহমানের মতে, উদ্যোগটির ধারণা ছিল ভালো। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেবাটি চালু রেখে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে এটি দেশের অন্য বিভাগীয় শহরগুলোর জন্যও অনুসরণযোগ্য হতে পারত।

তিনি বলেন, ‘ওয়াইফাই সিটি’ ও ‘স্মার্ট সিটি’ এখন বিশ্বজুড়ে পরিচিত ধারণা। সিলেটে এই উদ্যোগ ভালোভাবে শুরু করে ধরে রাখা গেলে অন্য বিভাগীয় শহরেও এমন প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো এবং নগরবাসী উপকৃত হতে পারতেন।

প্রকৃতির সৌন্দর্যে যে সিলেট মানুষের মন কাড়ে, সেই নগরকে প্রযুক্তির আধুনিকতার সঙ্গেও এগিয়ে নেওয়ার যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, ‘ওয়াইফাই সিটি’ ছিল তারই একটি প্রতীক। আজ নগরের বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকা নীরব যন্ত্রপাতিগুলো সেই স্বপ্নের কথাই মনে করিয়ে দেয়। একদিন আবার সেগুলোতে আলো জ্বলবে কি না, ফিরে আসবে কি না নগরবাসীর সেই কাঙ্ক্ষিত সংযোগ—তার উত্তর এখন অপেক্ষা করছে নতুন পরিকল্পনা, সমন্বয় ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগের ওপর।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর