মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৭ অপরাহ্ন

গর্তে গর্তে ক্ষতবিক্ষত ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক, ঝুঁকির পথে হাজারো মানুষ

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৭/১০/২০২৬ ১০:০৫:৪৯ পূর্বাহ্ন

গর্তে গর্তে ক্ষতবিক্ষত ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক, ঝুঁকির পথে হাজারো মানুষ


ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জ অংশে যেন ক্ষতবিক্ষত এক দীর্ঘ পথ। প্রায় ৫০ কিলোমিটারজুড়ে সড়কের বুকে পিচের আস্তরণ উঠে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত। বৃষ্টির পানি জমে সেই গর্তগুলো আড়াল হয়ে যায়, আর প্রতিটি বাঁক ও প্রতিটি গর্ত হয়ে ওঠে দুর্ঘটনার নীরব ফাঁদ। প্রতিদিন এই পথ পাড়ি দেওয়া মানুষের কাছে যাত্রা এখন আর স্বস্তির নয়, বরং অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের।

সড়কের এই বেহাল দশায় একদিকে যেমন ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল, অন্যদিকে বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে চলাচলকারী চালক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতিনিয়ত পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ।

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন অংশে সড়কের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। শেরপুর থেকে আউশকান্দি, মিনাজপুর, জালালপুর, সৈয়দপুর, গোপলার বাজার, দেবপাড়া, ফুলতলী, পানিউমদা, বড়চর, বাহুবল ও মীরপুর একের পর এক এলাকায় সড়কের বুকজুড়ে ছড়িয়ে আছে খানাখন্দ। কোথাও পিচ উঠে গেছে, কোথাও তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত। ভাঙাচোরা পথ ধরে যানবাহন চলাচল করছে ধীরগতিতে, আর চালকদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে সতর্কতার পরীক্ষায়।

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন ছুটে চলে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক-লরি, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু ক্ষতবিক্ষত সড়কে গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে চালকদের নিতে হচ্ছে বাড়তি ঝুঁকি। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, সময়মতো সংস্কার না হলে যেকোনো মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে বড় দুর্ঘটনা।

বাসচালক রহিম আলীর কাছে এই সড়কে গাড়ি চালানো যেন প্রতিদিনের এক কঠিন পরীক্ষা। তিনি বলেন, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। যাত্রীরাও আতঙ্কে থাকেন। দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়েই প্রতিনিয়ত গাড়ি চালাতে হচ্ছে তাঁকে।

ট্রাকচালক কদর আলীর অভিজ্ঞতাও একই রকম। মালবোঝাই ট্রাক নিয়ে ভাঙাচোরা সড়ক পাড়ি দেওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বৃষ্টির পানি জমে গর্ত আড়াল হয়ে গেলে বিপদের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।

যাত্রী আব্দুল আলীর অভিযোগ, অতিরিক্ত ভারী যানবাহনের চলাচলে সড়কের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। তাঁর মতে, দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে কিছু যানবাহন সড়কের পাশের অংশ দিয়ে চলাচল করছে। এতে শুধু চালক ও যাত্রী নন, ঝুঁকির মুখে পড়ছেন পথচারীরাও। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মহাসড়কের পাশে বসবাসকারী মানুষের মনেও দেখা দিয়েছে আতঙ্ক কখন কোন গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপদ ডেকে আনে, সেই শঙ্কা যেন নিত্যদিনের সঙ্গী।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে সড়ক সংস্কার করা হলেও সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার উঠে যায় পিচের আস্তরণ, ফিরে আসে গর্ত আর খানাখন্দ। একই জায়গায় বারবার সংস্কারকাজ চললেও স্থায়ী সমাধান না মেলায় দুর্ভোগের চক্র ভাঙছে না।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ সরকার বলেন, মহাসড়কের বর্তমান পরিস্থিতির কথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংস্কারকাজে অনিয়মের বিষয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় বলেও জানান তিনি।

দ্রুত সংস্কারকাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন আউশকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুহিবুর রহমান হারুন। তাঁর ভাষ্য, মহাসড়কের বেহাল দশায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে তিনি সড়ক, সেতু ও পরিবহনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

এদিকে নবীগঞ্জ–বাহুবল এলাকার সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, জনদুর্ভোগের বিষয়টি তিনি জাতীয় সংসদে তুলে ধরবেন। প্রয়োজনে জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের মাধ্যমে সড়ক, সেতু ও পরিবহনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন।

ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জ অংশের এই দুরবস্থা কেবল ভাঙাচোরা পিচ আর গর্তের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের নিরাপদে ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা, শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্নে বিদ্যালয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা এবং পণ্য পরিবহনের স্বাভাবিক গতি।

বৃষ্টির পানিতে ঢাকা গর্তগুলো প্রতিদিন নতুন করে সামনে আনছে পুরোনো প্রশ্ন কবে মিলবে এই পথের স্থায়ী মুক্তি? কবে ঝুঁকির বদলে স্বস্তি নিয়ে এই মহাসড়ক পাড়ি দিতে পারবেন চালক, যাত্রী ও পথচারীরা?

এখন স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, আশ্বাসের গণ্ডি পেরিয়ে দ্রুত শুরু হোক কার্যকর সংস্কার। কারণ, একটি মহাসড়কের গর্ত শুধু যানবাহনের গতিই থামায় না, থামিয়ে দেয় মানুষের স্বস্তি, বাড়িয়ে দেয় জীবনের ঝুঁকি। নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয় এটি মানুষের অধিকার, আর সেই অধিকার নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর