ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শান্তিতে নোবেলজয়ী। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দেড় বছর। ক্ষমতায় থাকার সময় দেশের মানুষের ভাগ্যবদলের অনেক গল্প শুনিয়েছিলেন। দেশকে এগিয়ে কোথায় নিয়ে যাবেন তার লম্বা ফিরিস্তি দিতেন প্রতিদিন। ইউনূস আমলে দেড় বছরে দেশের কী হাল হয়েছে তা এখন সবাই জানে। তা নিয়ে আজ আলোচনা করতে চাই না। কিন্তু দেশদরদি এই শান্তির দূত আজ কোথায়?
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই আকস্মিক বন্যায় চট্টগ্রাম, পার্বত্য তিন জেলাসহ দেশের প্রায় অর্ধেক জনপদ ডুবে গেল। চট্টগ্রাম বিভাগে টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা শতাধিক। নদীর পানি বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় পাঁচ জেলার লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে ব্যাপকভাবে। সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ীরা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন যে-যার মতো করে। যার যতটুকু সামর্থ্য আছে তা নিয়ে সর্বস্তরের মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছে বন্যাকবলিতদের। কিন্তু এ দুর্যোগে অসহায় মানুষ শান্তিতে নোবেলজয়ীর কাছ থেকে একটা সান্ত্বনার বাণীও শুনতে পায়নি। দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো দূরের কথা, তাদের জন্য একটু সহানুভূতি প্রকাশ পর্যন্ত করেননি সাবেক প্রধান উপদেষ্টা। এ বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে তিনটি কারণে।
প্রথমত ড. ইউনূসের জন্মস্থান চট্টগ্রাম। তিনি চট্টগ্রামের সন্তান। এখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা, শিক্ষা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে ক্ষুদ্র ঋণের ওপর গবেষণা শুরু করেন। এখান থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় গ্রামীণ ব্যাংক। এই গ্রামীণ ব্যাংকই তাঁকে সারা বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। কাজেই চট্টগ্রামের প্রতি, সেখানকার মানুষের প্রতি তাঁর আলাদা ভালোবাসা ও দরদ থাকাটাই স্বাভাবিক। এজন্যই প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর তিনি যখন খুঁজে খুঁজে চট্টগ্রামের লোকদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতেন, তখন আমরা কেউ কিছু মনে করিনি। এলাকাপ্রীতি সবারই থাকে, তিনি যতই আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় হোন না কেন।
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তিনি একাধিকবার চট্টগ্রামে গেছেন, সেখানকার মানুষকে আপনজন হিসেবে সম্বোধন করেছেন। তাই এবার চট্টগ্রামে যখন সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হলো, তখন আমরা আশা করেছিলাম তিনি চট্টগ্রামে ছুটে যাবেন। দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। অসহায় মানুষকে তাঁর জাদুকরী ভাষণে উদ্বুদ্ধ করবেন। তাঁর মিষ্টি কথা শুনে বন্যায় সব হারানো মানুষ তাদের কষ্ট ভুলে যাবে। কিন্তু কোথায় কী? তিনি চট্টগ্রাম গেলেন না। তিনি ঢাকায় ইউনূস সেন্টারের নিত্যনতুন প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত থাকলেন। দ্বিতীয়ত ড. মুহাম্মদ ইউনূস সব সময় দারিদ্র্যমোচনের কথা বলেন। তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দারিদ্র্যমোচনের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য।
২০০৬ সালে পুরস্কার পেয়ে ড. ইউনূস বলেছিলেন, তিনি দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠাবেন। ইউনূসের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কুড়ি বছর পেরিয়ে গেছে, বিশ্ব দারিদ্র্যমুক্ত হয়নি। বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশে নতুন করে দেড় কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। দারিদ্র্যমোচনের লক্ষ্যে দেশ পরিচালনার বিরাট সুযোগ পেয়ে ইউনূস তা কাজে লাগাতে পারেননি।
তাই চট্টগ্রামের বন্যা দারিদ্র্যমোচনে ড. ইউনূসের আন্তরিকতা প্রমাণের একটি সুযোগ তৈরি করেছিল। তিনি প্রমাণ করতে পারতেন যে সবকিছু তিনি নিজের নামযশের জন্য করেন না। গরিব ও প্রান্তিক মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে তিনি আন্তরিক। কিন্তু শান্তির দূতের নীরবতা আর উদাসীনতা আরেকবার প্রমাণ করেছে, তিনি যা কিছু করেন নিজের স্বার্থে। বন্যাদুর্গত বা দুর্যোগে বিপন্ন মানুষের প্রতি তাঁর কোনো দায়বদ্ধতা ও সহানুভূতি নেই। তৃতীয়ত ইউনূসের ২০টির বেশি সামাজিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার সবকটিতেই দুর্যোগ নিরসনে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামের স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্যোগে ইউনূস নিজেই প্রমাণ করলেন, তাঁর এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য হলো গরিব মানুষকে দেখিয়ে ব্যবসা করা।
দারিদ্র্যমোচন বা মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাঁর এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো অবদান নেই। ড. মুহাম্মদ ইউনূস হলেন বাংলাদেশের সুশীল সমাজের প্রতীক। তিনি এ দেশের সুশীলদের অবিসংবাদিত নেতা। বিশেষ করে যেসব সুশীল উন্নয়নের ফেরিওয়ালা, তাঁদের পথপ্রদর্শক ইউনূস। এই সুশীলরা উন্নয়নের কাহিনি শুনিয়ে, দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা বলে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা আনেন। নিজেরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। এসব উন্নয়নের দোকানে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন না হলেও সুশীলরা জাতির বিবেক বনে যান।
তাঁরা সুশাসন, মানবাধিকারের কথা বলেন, রাজনীতিবিদদের চরিত্র হনন করেন। উন্নয়ন ব্যবসা অব্যাহত রাখতে, দেশের অর্থনীতি যেন স্বাবলম্বী না হয় সেজন্য বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করেন। উন্নয়নের নামে তাঁরা দেশকে চিরস্থায়ীভাবে বিদেশি ঋণ আর অনুদানের চক্রে বন্দি রাখতে চান। কিন্তু দেশের মানুষের বিপদে, দুর্যোগে তাঁদের পাশে পাওয়া যায় না। এবারে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে বন্যা এ সত্য নতুন করে সামনে নিয়ে এলো। শুধু এ বন্যা নয়, আমাদের সুশীলরা মানুষের কোনো সমস্যায় পাশে দাঁড়ান না। তাঁদের একমাত্র কাজ হলো অন্যের সমালোচনা করা। সুশীলরা যেভাবে কথা বলেন তাতে মনে হয়, একমাত্র তাঁরাই সাধু আর সবাই খারাপ। কিন্তু এই সাধুরা দেশের সব সংকটে কেন শীতনিদ্রায় যান, তার উত্তর নেই।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আজকের সিলেট ডেস্ক 








