ফায়ার স্টেশন-ল্যাব ছাড়াই তামাবিল বন্দরে মিথানল, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৫ AM

ফায়ার স্টেশন-ল্যাব ছাড়াই তামাবিল বন্দরে মিথানল, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৩/০৯/২০২৬ ০৯:৪৮:১৭ AM

ফায়ার স্টেশন-ল্যাব ছাড়াই তামাবিল বন্দরে মিথানল, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি


সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দরে প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও রাসায়নিক পরীক্ষার অবকাঠামো না থাকলেও নিয়মিত ঢুকছে উচ্চমাত্রার দাহ্য রাসায়নিক মিথানল। বন্দরে নেই কেমিক্যাল ল্যাব, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম কিংবা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। এর মধ্যেই আগের তুলনায় মিথানল আমদানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বন্দরের শত শত শ্রমিক-চালক ও সেখানে থাকা যানবাহন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বন্দরে মিথানল থেকে কোনোভাবে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হলে তা দ্রুত ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাদের দাবি, এমন পরিস্থিতিতে পুরো বন্দর আগুনে পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রমিক-চালকসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়বে। সম্প্রতি তামাবিল দিয়ে মিথানল আমদানি বেড়ে যাওয়ার পেছনেও রহস্য রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

সপ্তাহে ৪-৫ গাড়ি থেকে এখন প্রতিদিন ৭-৮

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় ভারত থেকে সপ্তাহে ৪-৫টি মিথানলবাহী ট্যাংকলরি তামাবিল স্থলবন্দরে প্রবেশ করত। বর্তমানে প্রতিদিন অন্তত ৭-৮ গাড়ি করে মিথানল আসছে। বন্দরের ভেতরেই কোনো ধরনের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই ট্যাংকলরি থেকে এসব রাসায়নিক ড্রামে স্থানান্তর করা হয়।

এরপর মিথানলের নমুনা সিলেটের বিভিন্ন ল্যাবে পাঠানো হয়। পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত কন্টেইনারগুলো অন্তত দুইদিন বন্দরে অবস্থান করে। রিপোর্ট পাওয়ার পর সেগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মিথানল একটি বর্ণহীন, উদ্বায়ী ও অত্যন্ত দাহ্য রাসায়নিক তরল। শিল্পকারখানায় এটি মূলত দ্রাবক বা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে মানুষের জন্য এটি মারাত্মক বিষাক্ত। বাতাসে মিথানলের বাষ্প নির্দিষ্ট মাত্রায় মিশে আগুনের সংস্পর্শে এলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে এবং দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে।

মিথানল ফ্যাকাশে নীল শিখায় জ্বলে, যা সাধারণ আলোতে সহজে দেখা যায় না। ফলে কোথাও আগুনের সূত্রপাত হলে সেটি দ্রুত শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

একটি সূত্র জানিয়েছে, ভারতের আসাম রাজ্যের পার্বতপুর-ডিব্রুগড় পেট্রোকেমিক্যাল থেকে বাংলাদেশে মিথানল আমদানি করা হচ্ছে। দেশের কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান তামাবিল বন্দর ব্যবহার করে এসব মিথানল আমদানি করেছে।

‘প্রতিদিন ৮-১০ গাড়ি মিথানল আসছে’

তামাবিল স্থলবন্দরের আমদানিকারক ফারুক আহমদ বলেন, ব্যবসায়ীদের বর্তমান অবস্থা আগের মতো ভালো নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকাংশে কমে গেছে। আগে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ ট্রাক পাথর আমদানি হলেও এখন গড়ে ৭০০ ট্রাকের ওপরে আমদানি হয় না।

মিথানল আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে তামাবিল বন্দর দিয়ে মিথাইল আমদানি বেড়েছে। আগে সপ্তাহে ৪-৫টি ট্যাংকলরি ভারত থেকে আসতো। এখন প্রতিদিনই ৮-১০ গাড়ি মিথানল ভারত থেকে আসছে। এসব ট্যাংকলরি থেকে ড্রামে রাখা হয় মিথানল।’

বন্দরের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ফারুক আহমদ বলেন, ‘একটা ফায়ার স্টেশনও নেই। রাসায়নিক থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে তা নির্বাপণ করার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। প্রতিদিন এই অবস্থার মধ্যেই আমাদের শ্রমিকরা বন্দরে কাজ করছেন। এতে জানমাল দুটোই নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে।’

২০২৪ সালে মিথানলবাহী লরিতে আগুন

তামাবিল স্থলবন্দরে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতির বিষয়টি নতুন নয়। ২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর দুপুর ২টার দিকে বন্দরে একটি ভারতীয় মিথানলবাহী লরির সামনের অংশে আগুন লাগে। ঘটনাটি ঘিরে পুরো এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে।

খবর পেয়ে জৈন্তাপুর উপজেলার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনকে জানানো হলেও সেখানকার সদস্যদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হয়। পরে ডাউকি স্থলবন্দরের ফায়ার সার্ভিসের একটি পানিবাহী গাড়ি স্থানীয়দের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বন্দরে থাকা অন্য মিথানলবাহী ট্যাংকলরি, পাথর ও কয়লাবাহী শত শত ভারতীয় ট্রাক দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। আতংকে বন্দরে থাকা কয়েক হাজার শ্রমিক ও সাধারণ মানুষও নিরাপদ স্থানে চলে যান। ওই ঘটনার পর থেকে বন্দরে মিথানল নিয়ে সবসময়ই আতংক কাজ করে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

রাসায়নিক পরীক্ষার নিজস্ব ল্যাব নেই

তামাবিল বন্দরের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, আমদানি করা রাসায়নিক পদার্থ পরীক্ষা করার জন্য সেখানে কোনো কেমিক্যাল ল্যাব বা টেস্টিং মেশিন নেই। একই সঙ্গে মিথানলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও পর্যাপ্ত নয়।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একটি বিপজ্জনক রাসায়নিকের পরীক্ষা করার নিজস্ব ল্যাব যেখানে নেই, সেখানে নিয়মিত মিথানলবাহী ট্যাংকলরি প্রবেশ ও পণ্য খালাসের অনুমতি কীভাবে দেওয়া হচ্ছে।

মিথানল আমদানিতে ‘প্রভাবশালী চক্র’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কাগজে-কলমে সিলেটের কোনো প্রতিষ্ঠান মিথানল আমদানির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও একটি প্রভাবশালী চক্র তামাবিল বন্দর দিয়ে এই রাসায়নিক আমদানিতে সহযোগিতা করছে। নিরাপত্তা অবকাঠামোর ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও কেন এই বন্দরকে মিথানল আমদানির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীরা।

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) কেমিক্যাল ইঞ্জনিয়ারিং ও পলিমার সায়েন্সের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাস্তাবুর রহমান বলেন, ‘মিথানল একটি উচ্চ মাত্রার দাহ্য পদার্থ। এটি কাস্টমসের সব নিয়ম মেনেই আমদানি করা উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে আমাদের ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা করা হতো। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ল্যাবে পরীক্ষা হয় না। অন্য একটি গ্রুপ এখন পরীক্ষা করে।’

‘বিস্ফোরণ হলে পুরো বন্দর পুড়ে ছাই’

তামাবিল বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ। তিনি বলেন, ‘মিথানল এতটা শক্তিশালী দাহ্য পদার্থ, যদি বিস্ফোরণ ঘটে তাহলে পুরো তামাবিল বন্দর পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। এত ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ আমদানি করা হচ্ছে অথচও কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। এটা এক ধরনের তামাশা।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের এত বন্দর থাকতে সিলেট দিয়ে মিথানল আমদানি একেবারে স্বাভাবিক বিষয় না। এখানে কিছু একটা আছে। আমরা চাই দেশে আমদানি অব্যাহত থাকুক। কিন্তু শতভাগ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগে নিশ্চিত করতে হবে।’

অনুমতি এনবিআরের, নতুন প্রকল্পে ফায়ার সার্ভিস

তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন মিথানল আমদানির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বন্দরটির সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এই আমদানির সঙ্গে সিলেটের স্থানীয় কোনো প্রতিষ্ঠান সরাসরি যুক্ত নয়। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু শুল্কায়ন ও খালাসের কাজে সহযোগিতা করে। মূলত ঢাকার দুটি গ্রুপ তাদের কোম্পানির মাধ্যমে মিথানল নিয়ে আসে।

বন্দরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টিও স্বীকার করেন তিনি। মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘যেহেতু এই আমদানির অনুমতি এনবিআর থেকে দেওয়া হয়, তাই বন্দর কর্তৃপক্ষ হিসেবে এটি নিষেধ করার সুযোগ নেই। তবে এখানে কোনো ফায়ার সার্ভিস সিস্টেম না থাকার বিষয়টি এরইমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে বন্দরে একটি নতুন প্রকল্পের কাজ চলমান। যেখানে সম্পূর্ণ ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

মিথানল পরীক্ষার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি জানান, বন্দরে আসার পর প্রতিটি ড্রাম থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হয়। পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতেই পণ্য খালাস বা রিলিজ দেওয়া হয়।

তার ভাষায়, ‘মিথানল বন্দরে আসার পর প্রতিটি ড্রাম থেকে নমুনা সংগ্রহ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট দেখেই পণ্য খালাস বা রিলিজ দেওয়া হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট আসতে ন্যূনতম দুদিন সময় লেগে যায়।’

ফলে তামাবিল স্থলবন্দরে একদিকে বাড়ছে মিথানলের আমদানি, অন্যদিকে এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ও রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো। এতে বন্দরের শ্রমিক, চালক, ব্যবসায়ী ও সেখানে থাকা যানবাহনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর