সিলেট নগরের রায়নগরে মা-বাবা ও গৃহকর্মী হত্যার ঘটনায় এবারও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সঠিক বিচারের দাবি জানিয়েছেন নিহত দম্পতির সন্তানেরা। বুধবার দুপুরে নগরের জল্লারপার এলাকার খান হাউসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা তাদের একমাত্র দাবি।
এটি ছিল এ ঘটনায় নিহত আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের সন্তানদের দ্বিতীয় সংবাদ সম্মেলন। এতে বক্তব্য দেন তাদের মেয়ে সেলিনা সুলতানা শিখা ও তারানা সুলতানা শিমু।
সংবাদ সম্মেলনে নিহতদের সন্তানেরা জানান, গতকাল মঙ্গলবার সিলেট সফরে আসা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. সালাহউদ্দিনের সঙ্গে তারা সাক্ষাৎ করে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেন। পাশাপাশি তদন্ত দ্রুত শেষ করার জন্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন আশ্বাসে আশাবাদ ব্যক্ত করে তারা বলেন, এবার হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে এবং তারা ন্যায়বিচার পাবেন।
দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য সিলেটের সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান নিহতদের সন্তানেরা। হত্যাকাণ্ডের পর ন্যায়বিচারের দাবিতে যারা তাদের পরিবারের পাশে ছিলেন, তাদের পাশাপাশি সিলেটের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সহযোগিতার কথাও তারা উল্লেখ করেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, মামলার এজাহারে নির্দিষ্ট করে কারও নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করা হয়নি। তবে তাদের বাবা আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে জায়গাসংক্রান্ত বিরোধ একজন আইনজীবীর ছিল—এ বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়েছে।
ওই আইনজীবী হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না, তা তদন্ত করে বের করার দায়িত্ব পুলিশের উল্লেখ করে নিহতদের সন্তানেরা বলেন, তারা কোনো পক্ষের প্রভাবমুক্ত তদন্ত চান।
স্বজনেরা আরও বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও যদি তারা সুষ্ঠু বিচার থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সিলেটবাসীকে তাদের পরবর্তী কর্মসূচি জানানো হবে।
যেভাবে ঘটেছিল হত্যাকাণ্ড
গত ১২ আগস্ট সকালে সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় নিজ বাসা থেকে আওয়ামী লীগ নেতা ও সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক এম এ সাত্তার (৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম (১৫)-এর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘটনার দিনই বাবুল মিয়া নামের এক রংমিস্ত্রিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে বাবুল মিয়া হত্যার দায় স্বীকার করেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
তবে হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে বাবুল মিয়ার বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তার বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছিল, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের জেরে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বাবুল দাবি করেন, টাকা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ার পর তিনি তিনজনকে হত্যা করেন। দুই বক্তব্যে ভিন্নতা থাকায় হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিয়ে নিহতদের পরিবারসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আগেও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দিন পর, ১৭ আগস্ট নিহত দম্পতির প্রবাসী ছেলে-মেয়েরা তাদের বাসায় সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সেবারও তারা ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও করা হয়।
পুলিশের তদন্ত নিয়ে সন্তুষ্ট না হলে মামলাটি অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তরের দাবিও জানিয়েছিলেন তারা।
এর মধ্যে গত সোমবার ‘ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা কমিটি’ সংবাদ সম্মেলন করে। পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও লিজগ্রহীতাদের সমন্বয়ে গঠিত ওই কমিটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, বাবুল মিয়ার কাছ থেকে জোর করে জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে নিহত দম্পতির সন্তানেরা দ্বিতীয়বারের মতো সংবাদ সম্মেলন করে আবারও হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সঠিক বিচারের দাবি জানালেন।
আজকের সিলেট/ জেকেএস









