অবৈধ ইজিবাইকে যানজটের ফাঁদে সুনামগঞ্জ শহর, ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে ঘণ্টার বেশি
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩০ AM

অবৈধ ইজিবাইকে যানজটের ফাঁদে সুনামগঞ্জ শহর, ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে ঘণ্টার বেশি

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৭/০৯/২০২৬ ১০:০৬:০২ AM

অবৈধ ইজিবাইকে যানজটের ফাঁদে সুনামগঞ্জ শহর, ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে ঘণ্টার বেশি


সুনামগঞ্জ পৌর শহরের সড়কে লাইসেন্সবিহীন ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় যানজট এখন নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে একের পর এক অবৈধ স্ট্যান্ড। ফলে মাত্র ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে অনেক সময় এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগছে।

পৌরসভা ও ইজিবাইক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, শহরে চলাচলের জন্য বৈধ অনুমোদন রয়েছে ১ হাজার ৩০০টি ইজিবাইক এবং ১ হাজারটি ব্যাটারিচালিত রিকশার। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ হাজার বৈধ—অবৈধ যানবাহন শহরের সড়কে চলাচল করছে। এর মধ্যে অনুমোদনহীন অনেক গাড়ির চালকই ১৪ থেকে ১৬ বছরের অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অদক্ষ চালক ও বেপরোয়া গতির এসব যানবাহনের কারণে প্রায় প্রতিদিনই ছোট—বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে পথচারী ও শিক্ষার্থীদের অনেকে আহত হচ্ছেন।

শহরের যানজটের পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিশ সড়কে উপস্থিত থাকলেও তাদের সামনেই ট্রাফিক আইন অমান্য করে অবৈধ যানবাহন চলাচল করছে।

অনুসন্ধানে ও স্থানীয়দের অভিযোগে আরও জানা যায়, ইজিবাইক সমিতির প্রভাবশালী সদস্য এবং ট্রাফিক পুলিশের এক শ্রেণির কর্মকর্তা—কর্মচারীকে মাসিক চাঁদা দেওয়ার মাধ্যমে অনেক অবৈধ গাড়ি সড়কে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে। লাইসেন্সবিহীন এক চালকের ভাষ্য, মাসে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা দিলে লাইসেন্স না থাকলেও পুলিশ বা সমিতির পক্ষ থেকে কোনো বাধা আসে না। টাকা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করেই গাড়ি চালানো হয় বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে, বৈধ চালকেরা প্রতি বছর ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা পৌরকর দিয়ে লাইসেন্স নিলেও অবৈধ যানবাহনের বাড়বাড়ন্তে তাদের আয় কমে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, চাঁদার বিনিময়ে সড়ক দখল করে অবৈধ স্ট্যান্ড তৈরি হওয়ায় বৈধ যানবাহন পরিচালনাকারীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন।

সকাল ৯টার পর থেকেই জেলা শহরমুখী মানুষের চাপ বাড়তে থাকে। কালীবাড়ি, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ওয়েজখালী, নতুন বাসস্ট্যান্ড, মল্লিকপুর, কাজীর পয়েন্ট ও ষোলঘর এলাকায় যানজট তীব্র আকার ধারণ করে। আলফাত স্কয়ার, পৌর মার্কেট ও কোর্ট পয়েন্টের প্রধান সড়ক এবং ফুটপাতের ওপর গাড়ি থামিয়ে যাত্রী উঠানো—নামানো হয়।

ফুটপাত দখলে চলে যাওয়ায় পথচারীদের অনেকেই বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করছেন। এতে স্কুল—কলেজের শিক্ষার্থী ও অফিসগামী মানুষের পাশাপাশি জরুরি সেবার অ্যাম্বুলেন্সও দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে পড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে শহরবাসীর দাবি, দ্রুত লাইসেন্সবিহীন ইজিবাইক উচ্ছেদ, অবৈধ স্ট্যান্ড বন্ধ এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে শহর রক্ষায় রাজপথে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ।

তবে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা ইজিবাইক সমিতির সভাপতি সোহেল আহমদ। তিনি বলেন, তাঁদের কোনো সদস্য চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নন। অবৈধ যানবাহনের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাঁর দাবি, ১,৩০০ ইজিবাইক ও ১,০০০ ব্যাটারিচালিত রিকশার বাইরে থাকা সব যানবাহনই অবৈধ। পৌরসভা ও পুলিশ চাইলে একদিনেই এসব যানবাহন বন্ধ করতে পারে। এ বিষয়ে প্রশাসনকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

ট্রাফিক পুলিশের টিআই সুশান্ত চাকমা বলেন, ছোট শহরে অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে পুলিশও অতিষ্ঠ। তিনি সড়কে অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট বা অভিযান চালানোর পর ওপরের মহল থেকে ফোন করে অনেক সময় গাড়ি ছেড়ে দিতে বলা হয় বলে জানান। ‘এসব গাড়ি ধরা যাবে না’—এ ধরনের চাপের কারণে ট্রাফিক পুলিশ অনেকটা অসহায় অবস্থায় রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সুনামগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক অসীম চন্দ্র বণিক জানান, পৌর শহরের বিভিন্ন স্থানে সিএনজি ও ইজিবাইকের যত্রতত্র স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। শহরবাসীর চলাচল নির্বিঘ্ন করতে এ বিষয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহহিত করে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, অবৈধ লাইসেন্স বিহীন ইজিবাইকের কারণে প্রতিদিনই শহরে যানজট তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হলেও পরে আবার এসব যানবাহন এসে একই জায়গা দখল করছে।

অসীম চন্দ্র বণিক জানান, কয়েকদিনের ভেতরে শহরে মাইকিং করে অবৈধ লাইসেন্স বিহীন গাড়ির বিষয়ে জানানো হবে। এরপর অবৈধ লাইসেন্সবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর