মৌলভীবাজারে খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত, তবু বাজারে ভরসা বাইরের পণ্যে
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৭ PM

মৌলভীবাজারে খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত, তবু বাজারে ভরসা বাইরের পণ্যে

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১১/০৯/২০২৬ ০২:৫৯:৩৫ PM

মৌলভীবাজারে খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত, তবু বাজারে ভরসা বাইরের পণ্যে


মৌলভীবাজারে জেলার মানুষের চাহিদার তুলনায় বছরে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৫৯ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বেশি উৎপাদন হচ্ছে বলে তথ্য দিয়েছে কৃষি অধিদপ্তর। কিন্তু স্থানীয় বাজারের চিত্র সেই হিসাবের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না। জেলার বাজারগুলোতে ‘উদ্বৃত্ত’ উৎপাদনের দৃশ্যমান প্রভাব নেই; বরং বছরের বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন জেলার শস্য ও সবজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে স্থানীয় মানুষকে।

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, জেলার ২১ লাখ মানুষের বছরে খাদ্যশস্যের চাহিদা ৪ লাখ ১৫ হাজার ৫৫৩ মেট্রিক টন। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ৬ লাখ ৩০ হাজার ৬১২ মেট্রিক টন। সেই হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার কথা ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৫৯ মেট্রিক টন। এই পরিসংখ্যান নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে—উৎপাদন উদ্বৃত্ত হলে স্থানীয় বাজারে তার প্রতিফলন নেই কেন।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ধান উৎপাদনে মৌলভীবাজারের অবস্থান ভালো হলেও অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে জেলার মানুষকে অনেকটাই বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হয়। বিশেষ করে শীত মৌসুম ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় স্থানীয় বাজারে জেলার উৎপাদিত শাকসবজি পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায় না।

মৌলভীবাজারের আয়তন ২ হাজার ৭৯৯ বর্গ কিলোমিটার। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ফসিল জমি ২ লাখ ৩৬ হাজার ৯০৫ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদি জমি ১ লাখ ৪১ হাজার হেক্টর এবং নিট ফসলি জমি ১ লাখ ২৮ হাজার হেক্টর। এক ফসলি জমি ৪২ হাজার হেক্টর, দুই ফসলি ৬৩ হাজার হেক্টর, তিন ফসলি ২১ হাজার ৮৬৪ হেক্টর এবং চার ফসিল জমি ৭২০ হেক্টর।

শ্রমিক সংকট ও পর্যাপ্ত সেচ সুবিধার অভাবের মধ্যেও জেলার প্রধান ফসল ধান। পাশাপাশি কমলা, মাল্টা, লেবু, আনারস, কাঁঠাল, আলু, গ্রীষ্মকালীন টমেটো, গ্রাফটেড টমেটো, কচুসহ বিভিন্ন শাকসবজি, সরিষা, সূর্যমুখী ও ভুট্টার আবাদও বাড়ছে বলে কৃষি বিভাগের তথ্য।

বর্তমানে বোরো ধান ৬২ হাজার ১৪০ হেক্টর, আউশ ৩৮ হাজার ৫৩০ হেক্টর এবং আমন ৯৮ হাজার ৩৫ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে। এ ছাড়া ভুট্টা ২৮০ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন সবজি ৪ হাজার ১০৯ হেক্টর, শীতকালীন সবজি ১২ হাজার ২৫০ হেক্টর, মুখিকচু ১ হাজার ১৫০ হেক্টর, শীতকালীন টমেটো ১ হাজার ২২১ হেক্টর এবং গ্রীষ্মকালীন টমেটো ২১ হেক্টর জমিতে উৎপাদন করা হয়।

জেলায় কৃষক পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৬০ হাজার ৯০৭টি। এর মধ্যে ভূমিহীন ৫৫ হাজার ৪৭০টি, প্রান্তিক ১ লাখ ২ হাজার ৯৯৮টি, মাঝারি ২৯ হাজার ৭৫৯টি এবং বড় কৃষক পরিবার ৭ হাজার ৭১১টি। ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের বড় অংশই কৃষির ওপর নির্ভরশীল।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব পরিবারের অধিকাংশ ধান চাষে বেশি গুরুত্ব দেয়। অন্য ফসলের চাষ তুলনামূলক কম। আমন, আউশ, বোরো, সবজি, ফল, সরিষা, আলু ও টমেটোসহ বিভিন্ন ফসল সারা বছর উৎপাদন হলেও ধান ছাড়া অন্যান্য ফসলের বড় অংশ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য জমি দেওয়া হয় না।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়াও ফসলের বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। চাষাবাদে খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি রোগবালাইও বেড়েছে। ফসলে বেশি কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন করে কাঙ্ক্ষিত লাভ না পাওয়ায় অনেকে কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। অনেক কৃষক এখন মূলত নিজেদের পরিবারের চাহিদা মেটানোর মতো ফসলই চাষ করছেন।

কৃষক আনোয়ার খান ও মিজান আহমেদ জানান, তারা আউশ ও আমন ধান চাষ করেন। কখনো বন্যা, আবার কখনো খরায় ফসলের ক্ষতি হয়। এক একর জমি চাষে তাদের প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু ধান বিক্রির সময় কম দাম পাওয়া যায়। অন্যদিকে চাল কিনতে হয় বেশি দামে।

তাদের ভাষ্য, শীতকালে কিছু সবজি চাষ করা সম্ভব হলেও বছরের অন্য সময়ে তা কঠিন। এমনকি কৃষক হয়েও তাদের বাজার থেকে সবজি কিনে খেতে হয়। আবহাওয়া অনুযায়ী বীজ না পাওয়ার বিষয়টিও তারা উল্লেখ করেন।

সবজি ব্যবসায়ী হেলাল মিয়া বলেন, জেলার অধিকাংশ মানুষ সারা বছর বাইরের সবজির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় সবজি খুব কম পাওয়া যায়। কৃষকরা মূলত নিজেদের খাওয়ার জন্য শস্য উৎপাদন করেন। কিছু কৃষক বাণিজ্যিকভাবে কয়েক ধরনের ফসল চাষ করলেও তা মূলত শীত মৌসুমে। ফলে বাজারে বাইরের সবজিই বেশি বিক্রি হয়।

এদিকে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, আগের তুলনায় জেলায় ফসল উৎপাদন অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে ধানের উৎপাদন ভালো হচ্ছে। অন্যান্য ফসলের উৎপাদনও সময়ের সঙ্গে বাড়ছে। গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের মাধ্যমে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে এবং অঞ্চলভিত্তিক নতুন জাত আবিষ্কারের জন্য ব্যাপক কাজ চলছে।

চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ার পরও স্থানীয় বাজারে পণ্যের ঘাটতি দেখা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মো. জালাল উদ্দিন বলেন, কৃষকরা অধিক মূল্য পাওয়ার আশায় উৎপাদিত শাকসবজি থেকে শুরু করে বেশিরভাগ পণ্য জেলার বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এ কারণেই স্থানীয় বাজারে তার প্রভাব পড়ছে। তার দাবি, বাস্তবে ফল-ফসলসহ কোনো কিছুরই অভাব নেই জেলায়।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর