সিলেট নগরীর দীর্ঘদিনের আবদ্ধ একটি বড় জায়গা এবার জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পথে। পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের জমিতে নির্মাণ করা হবে নান্দনিক পার্ক। পাশাপাশি সেখানে গড়ে উঠবে ‘রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চ পর্যায়ের সভায় পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের জমি সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়।
দুপুর ১২টায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এমপি। এতে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি, সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান এবং কারা মহাপরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামালসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সিলেট নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এই জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরে কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পার্ক নির্মাণের উদ্দেশ্যে বাদাঘাটে কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ করা হলেও পুরোনো কারাগারের জায়গাটি এতদিন উঁচু দেয়ালের ভেতরেই ছিল।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সেই পরিস্থিতি বদলাবে। বিশাল এই জায়গায় থাকবে সবুজের পরিসর, হাঁটার পথ এবং নগরবাসীর অবসর কাটানোর সুযোগ। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বয়স্ক ও পরিবার নিয়ে আসা মানুষের জন্যও এটি একটি উন্মুক্ত স্থান হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিলেটকে গ্রিন, ক্লিন, নান্দনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, প্রস্তাবিত পার্ককে তারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুরোনো কারাগারের জায়গায় বিনোদন পার্ক নির্মাণ খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল। অন্যদিকে, সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও বিভিন্ন সময়ে নগরবাসীর জন্য জায়গাটি উন্মুক্ত করে সেখানে পার্ক নির্মাণের কথা বলেছেন।
এই উদ্যোগ এগিয়ে নিতে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি ও আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে আধা-সরকারি (ডিও) পত্র দেন। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে।
কমিটি সরেজমিনে পুরোনো কারাগারের জায়গা পরিদর্শনের পর সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে জমিটি সিলেট সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের সুপারিশ করে প্রতিবেদন দেয়।
বৃহস্পতিবারের সভায় সেই প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা শেষে পার্ক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণের জন্য জমিটি সিসিকের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়।
সভায় জমিটির ব্যবহার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুরোনো কারাগারের এই জায়গায় সিটি করপোরেশন কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবে না।
অর্থাৎ, জমিটির ব্যবহার জনকল্যাণ ও নাগরিক সুবিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
এদিকে কারাগারের সব বন্দিকে বাদাঘাটে অবস্থিত কারাগারে স্থানান্তর করা হবে। সেখানে ‘সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২’ নামে আরেকটি কারাগার নির্মাণ করা হবে।
শুধু বিনোদন ও নাগরিক অবকাশের জায়গা নয়, পুরোনো কারাগারের জমিতে ইতিহাস সংরক্ষণের ব্যবস্থাও থাকছে। পার্কের এক পাশে নির্মাণ করা হবে ‘রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’।
ফলে একই জায়গায় নগরবাসীর জন্য সবুজ ও উন্মুক্ত পরিসরের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার সুযোগ তৈরি হবে। নতুন প্রজন্ম বিনোদনের সঙ্গে দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার সঙ্গেও পরিচিত হতে পারবে।
জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এবার বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। পুরোনো কারাগারের জায়গায় নান্দনিক পার্ক হবে। এক পাশে হবে রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।”
তিনি জানান, অচিরেই পার্ক ও জাদুঘর নির্মাণের কাজ শুরু হবে। কারাগারের সব বন্দিকে বিদ্যমান কারাগারে স্থানান্তরের পর ধীরে ধীরে পুরো জায়গাটিকে পূর্ণাঙ্গ পার্কে রূপ দেওয়া হবে।
পুরোনো কারাগারের দেয়ালে ঘেরা জায়গাটি এতদিন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। সেই জমি উন্মুক্ত হলে নগরীর ব্যস্ত জীবনে নতুন একটি সবুজ পরিসর যুক্ত হবে। হাঁটা, অবসর কাটানো কিংবা পরিবার নিয়ে সময় দেওয়ার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটি হয়ে উঠবে ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণের একটি স্থান।
একসময় যে জায়গাটি ছিল কারাগারের উঁচু দেয়ালে আবদ্ধ, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সেটিই সিলেট নগরীর মানুষের জন্য উন্মুক্ত নাগরিক পরিসরে পরিণত হবে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস









