শতবর্ষেও বদলায়নি সিলেট-আখাউড়া রেলপথ, ডাবল লাইনের দাবি
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২২ AM

শতবর্ষেও বদলায়নি সিলেট-আখাউড়া রেলপথ, ডাবল লাইনের দাবি

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৩/০৯/২০২৬ ০৯:৩৩:১০ AM

শতবর্ষেও বদলায়নি সিলেট-আখাউড়া রেলপথ, ডাবল লাইনের দাবি


ব্রিটিশ আমলে পণ্য পরিবহনের উদ্দেশ্যে নির্মিত সিলেট-আখাউড়া রেলপথ পেরিয়েছে প্রায় একশত দশবছর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন রেলপথে উন্নয়ন হলেও ২৩৯ কিলোমিটারের এই রেলপথে সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া তেমন পড়েনি। পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ লাইনেই চলছে ট্রেন। দীর্ঘ তিন দশক ধরে ডাবল লাইনের দাবি থাকলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। এরই মধ্যে রেলপথটি মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

সিলেট-আখাউড়া রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ১৯১২ সালে এবং শেষ হয় ১৯১৫ সালে। ব্রিটিশ শাসনামলে মূলত পণ্য পরিবহনের কথা মাথায় রেখে এটি নির্মাণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে এ পথে যাত্রী চলাচলও বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে সিলেট অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে রেল।

তবে এক শতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই অনুপাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জনবল ও ইঞ্জিন সংকটের কারণ দেখিয়ে একের পর এক লোকাল ট্রেন ও স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ কাঙ্ক্ষিত রেলসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ২৩৯ কিলোমিটার রেলপথের বিভিন্ন অংশে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের ঘাটতি রয়েছে। অনেক জায়গায় রেললাইনের নাট-বল্টু, ফিশপ্লেট ও ক্লিপ পাওয়া যায় না। এসব যন্ত্রাংশ মাঝেমধ্যে চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কোথাও কোথাও বল্টুর পরিবর্তে সুতো দিয়ে বাঁধার মতো ঘটনাও দেখা গেছে।

এ ছাড়া শতবর্ষের পুরোনো বেশ কয়েকটি সেতুও রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। এসব কারণে রেললাইন দুর্বল হয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

একক লাইন হওয়ায় ট্রেন চলাচলেও রয়েছে বাড়তি ভোগান্তি। একটি ট্রেনকে অন্যটির জন্য ক্রসিংয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। আবার ইঞ্জিন ও লাইন দুর্বল থাকায় পাহাড়ি এলাকায় ট্রেনের গতি কমে যায় এবং চলাচলে বেশি সময় লাগে।

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ যাত্রীদের দীর্ঘদিনের দাবি—সিলেট-আখাউড়া রেলপথকে ডাবল লাইনে উন্নীত করা।

বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্র বলছে, সরাসরি ডাবল লাইন নির্মাণের পরিবর্তে সিলেট-আখাউড়া রেলপথকে মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে একই রেলপথে ভিন্ন মাপের ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে। নতুন ট্রেন যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দ্রুতগতির ট্রেন চলাচলের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

এ প্রকল্প নিয়ে চীনের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে।

তবে যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, শুধু ডুয়েলগেজ করলেই দীর্ঘদিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাদের মতে, একক লাইন থাকলে ট্রেনের ক্রসিংজনিত সমস্যা থেকেই যাবে।

ঢাকা-সিলেট রেলপথে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীরা জানান, আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত রেললাইনের বড় একটি অংশ দুর্বল। প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটে। তাদের ভাষ্য, পুরোনো লাইনে টুকটাক সংস্কারের পরিবর্তে বড় ধরনের অবকাঠামোগত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তাদের দাবি, ডাবল লাইন হলে ট্রেন চলাচল আরও নিরবচ্ছিন্ন হবে এবং ঢাকা থেকে সিলেটের যাত্রার সময়ও কমে আসবে। বর্তমানে সিলেট থেকে ঢাকা যেতে প্রায় আট ঘণ্টা সময় লাগে; ডাবল লাইন হলে তা অর্ধেকে নেমে আসতে পারে বলে তারা মনে করেন।

শমশেরনগর স্টেশনের বাসিন্দা গিলমান আহমেদ বলেন, ব্যবসায়িক কাজে তাদের নিয়মিত ঢাকায় যেতে হয়। কিন্তু ট্রেনের নানা ভোগান্তির কারণে অনেক ব্যবসায়ী এখন বাসে যাতায়াত করেন।

তার ভাষ্য, পাহাড়ি এলাকায় বেশিরভাগ ট্রেন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। পাশাপাশি রেল ক্রসিংয়ের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। ছোট কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও তার প্রভাব পড়ে একাধিক ট্রেনের সময়সূচিতে।

গিলমান আহমেদের মতে, এসব সমস্যা থেকে বের হওয়ার কার্যকর উপায় হলো সিলেট-আখাউড়া রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করা।

এই পথের নিয়মিত ট্রেনযাত্রী ও সচেতন নাগরিক মুহাম্মদ খান বলেন, আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ডাবল লাইন করা এখন অত্যন্ত জরুরি। তার মতে, শুধু ডুয়েলগেজ বা ব্রডগেজে রূপান্তর করলেই সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না।

তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথের কারণে যে নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে, সেটি থেকেই যাবে। একই সঙ্গে একক লাইনের কারণে ট্রেন ক্রসিংয়ের সমস্যাও থাকবে। ব্রডগেজ হলে ট্রেনের গতি বাড়তে পারে, কিন্তু পুরোনো সমস্যাগুলো পুরোপুরি দূর হবে না। কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলের মানুষের মূল দাবি ডাবল লাইন নির্মাণের।

কুলাউড়া রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার রুমান আহমেদ ও শমশেরনগর স্টেশনমাস্টার রজত কুমার রায় জানান, রেলপথটি ডাবল লাইন করা হবে কি না, সে বিষয়ে তাদের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তবে আখাউড়া-সিলেট রেলপথকে ব্রডগেজ করার পরিকল্পনার কথা তারা শুনেছেন।

তাদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে নতুন ও পুরাতন—দুটি ধরনের ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতি. মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন, সরকারিভাবে সিলেট-আখাউড়া রেললাইনকে মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে চীনের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, লাইনটি ডুয়েলগেজে উন্নীত হলে নতুন ট্রেন সংযোজন করা হবে। তখন ভিন্ন মাপের দুটি ট্রেন একই লাইনে চলাচল করতে পারবে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর