মরাচেলা নদীতে বালু লুট, ভাঙনের আতঙ্কে নরসিংপুরের কয়েক গ্রামের মানুষ
বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০২ PM

মরাচেলা নদীতে বালু লুট, ভাঙনের আতঙ্কে নরসিংপুরের কয়েক গ্রামের মানুষ

দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০১/১০/২০২৬ ১০:২২:১১ AM

মরাচেলা নদীতে বালু লুট, ভাঙনের আতঙ্কে নরসিংপুরের কয়েক গ্রামের মানুষ


মরাচেলা নদীর বুক ও তীর কেটে বালু তোলার অভিযোগে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নে বাড়ছে নদীভাঙনের আতঙ্ক। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি চক্র শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে। এতে নদীর তীর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে; ঝুঁকিতে পড়েছে সারপিনপাড়া, পূর্ব চাইরগাঁও, পূর্ব সোনাপুর, লোভিয়া, হাবিবনগর ও নাছিমপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এমনকি পূর্ব সোনাপুর জামে মসজিদ ও পূর্ব সোনাপুর হোসাইনিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসাও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন এলাকাবাসী। একাধিকবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন তারা। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, দৃশ্যমানভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। বরং রাতের আঁধারে নদীতে নৌকা নিয়ে এসে চলে বালু তোলার তৎপরতা।

এরই মধ্যে গত শনিবার রাতে বালু উত্তোলনের জন্য মরাচেলা নদীতে আসা একটি নৌকায় স্থানীয় উত্তেজিত জনতা আগুন ধরিয়ে দেন। পরদিন রবিবার সকালে পূর্ব সোনাপুর গ্রামের কয়েকটি বাড়িঘর বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে এমন অভিযোগ নিয়ে এলাকাবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যেতে চাইলেও সেদিন জেলা সমন্বয় সভায় থাকায় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারেননি তারা। পরে বিষয়টি দোয়ারাবাজার থানাকে জানানো হয়।

পূর্ব সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা আমির আলী বলেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নদীর পাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের নাম জানাতে পরামর্শ দিয়েছেন। নদীর কিনারে বালু উত্তোলনের জন্য নৌকা এলে পুলিশকে ফোনে জানানোর কথাও বলা হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, গত দুই বছর ধরে মরাচেলা নদী ও নদীর তীর থেকে বালু উত্তোলন চলছে। এর ফলে একের পর এক এলাকায় নদীভাঙনের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্থানীয় কয়েকটি এলাকা ঘুরে নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে ভাঙনের চিত্রও দেখা গেছে।

পূর্ব সোনাপুর গ্রামের আমির আলী বলেন, তাঁরা গ্রামবাসী দুই বছর ধরে বারবার আন্দোলন করে আসছেন। কয়েক দফা মানববন্ধনও করেছেন। কিন্তু মরাচেলা নদীতে বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখছেন না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় একটি চক্র নদী থেকে বালু তুলছে। শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার ব্যবহার করে নদীর পাড় কেটে বালু তোলা হচ্ছে। এতে একদিকে নদীর স্বাভাবিক তীর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে আশপাশের বসতবাড়ি ও ফসলি জমিও ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।

তাঁদের আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন চললেও এর সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে নৌকার শ্রমিকদের আটক করা হলেও বালু উত্তোলনের নেপথ্যে থাকা মূল ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে দাবি তাঁদের।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মরাচেলা নদীর তীরবর্তী একাধিক গ্রামের মানুষ এখন প্রতিদিন ভাঙনের আশঙ্কা নিয়ে বসবাস করছেন। সারপিনপাড়া, পূর্ব চাইরগাঁও, পূর্ব সোনাপুর, লোভিয়া, হাবিবনগর, নাছিমপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বসতবাড়ি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

বিশেষ করে পূর্ব সোনাপুর জামে মসজিদ ও পূর্ব সোনাপুর হোসাইনিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয়দের। তাঁদের দাবি, নদীর পাড় কেটে বালু তুলে নেওয়ার কারণে তীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। এখনই তা বন্ধ করা না গেলে বর্ষা ও নদীর স্রোতের সময় ভাঙন আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।

অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে নদীতীরবর্তী কিছু জমির মালিকও জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, প্রভাবশালী একটি চক্র এসব বালু সংগ্রহ করে বিক্রি করছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট এলাকায় বালুমহাল ইজারা দেওয়া হলেও নদীতে পর্যাপ্ত বালু না থাকায় ইজারাদার বা সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ নদীর তীর কেটে বালু সংগ্রহ করছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দোয়ারাবাজার থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, মরাচেলা নদী ইজারাবিহীন। অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। সোমবার রাতেও মোবাইল কোর্ট অভিযানে দুইজনকে আটক করা হয়েছে।

দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহ বলেন, নদীর পাড় কাটার প্রবণতা বেড়েছে এবং এতে পাড়ের গ্রামের মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন এটি সত্য অভিযোগ।

তিনি বলেন, যাদুকাটা বন্ধ হওয়ায় বালু খেকো বা ড্রেজার চালকরা এখানে ঝুঁকেছে। দোয়ারাবাজার উপজেলায় নদীর অবস্থান হলেও যোগাযোগের দূরত্ব অনেক বেশি। ছাতক হয়ে ঘুরে যেতে হয় সেখানে। রাতে যেভাবে তাণ্ডব চলে, সেটি মোকাবেলা করতে উপজেলার চেয়েও বেশি সক্ষমতার প্রয়োজন।

ইউএনও জানান, সোমবার রাতে সহকারি কমিশনার (ভূমি)-এর নেতৃত্বে সেখানে অভিযান চালিয়ে প্রায় দশলাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ছাতক নৌ পুলিশকে এই তাণ্ডব মোকাবেলায় আরও কঠোর হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এ ছাড়া পরিস্থিতি মোকাবেলায় আর কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানাবেন বলে জানান অরূপ রতন সিংহ।

মরাচেলা নদীর তীর ঘেঁষে বসবাসকারী মানুষের এখন একটাই দাবি নদী থেকে বালু উত্তোলনের নামে তীর কেটে নেওয়া বন্ধ হোক, জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, সড়ক ও ফসলি জমি রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হোক। তাঁদের আশঙ্কা, প্রশাসনিক নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা আরও বিলম্বিত হলে নদীর ভাঙন শুধু কয়েকটি বসতভিটা নয়, পুরো এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর