সাধারণত যে সময়ে হাওরের বীজতলা থেকে পানি সরে যাওয়ার কথা, তার প্রায় এক মাস আগেই এবার শুকিয়ে গেছে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার বীজতলার জমি। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকেই পানি নেমে যাওয়ায় কোথাও কোথাও জমিতে জন্মেছে সবুজ ঘাস, যা এখন গবাদিপশুর খাদ্য হয়ে উঠেছে। তবে আগেভাগে পানি সরে যাওয়ায় বোরো ধানের চারা তৈরির সময় নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। এখনই বীজতলা তৈরি করবেন, নাকি স্বাভাবিক মৌসুমের জন্য অপেক্ষা করবেন এমন সিদ্ধান্তহীনতায় দিন কাটছে তাঁদের।
কৃষকদের ভাষ্য, প্রতিবছর নভেম্বরের শেষ দিকে হাওরের জমি প্রস্তুত করে ধানের বীজ ছিটানো হয়। কিন্তু এবার প্রায় এক মাস আগেই পানি নেমে যাওয়ায় বীজতলা তৈরির জমি প্রস্তুত হয়ে গেছে। তবে আগাম বীজতলা তৈরি করে চারা রোপণ করলে ধানের ফলনে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। অন্যদিকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করলে পরে বীজতলা তৈরিতে কোনো সমস্যা হবে কি না, সেই উদ্বেগও রয়েছে তাঁদের মধ্যে।
আবহাওয়ার পরিবর্তনে সৃষ্ট এমন পরিস্থিতিতে বীজতলা তৈরি ও চাষাবাদের বিষয়ে কৃষি বিভাগের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। যদিও কৃষি বিভাগের দাবি, পানি কিছুটা আগে নেমে গেলেও বোরো আবাদে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই।
সরেজমিনে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর কার্তিক মাসের শেষ দিকে হাওরের বীজতলা থেকে পানি নামতে শুরু করে। এরপর নভেম্বরের শেষ দিকে জমি প্রস্তুত করে সেখানে ধানের বীজ ছিটান তাঁরা। কিন্তু এবার অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকেই বিভিন্ন এলাকার বীজতলার পানি নেমে গেছে। পানির অভাবে অনেক জমিতে জন্মেছে ঘাস। কোথাও কোথাও সেই ঘাস খাচ্ছে গবাদিপশু।
তাহিরপুর উপজেলার কালাশ্রীপুর গ্রামের কৃষক মো. আকবর আলী বলেন, ‘আমাদের হাওরের বীজতলা ২০-২৫ দিন আগে শুকিয়ে গেছে। এখন সবুজ ঘাসে রূপ নিয়েছে। গবাদিপশু বীজতলার ঘাস খাচ্ছে। অন্যান্য বছর আরও পরে শুকায় এবং আমরা নভেম্বরের শেষ দিকে বীজতলা তৈরি করে বীজ ছিটিয়ে দিই।’
একই উপজেলার পাটাবুকা গ্রামের কৃষক জুনায়েদ আহমদ জানান, তাঁদের এলাকার হাওরের বীজতলার পানিও এবার আগেভাগে নেমে গেছে। এ অবস্থায় কোনো কোনো কৃষক আগাম বীজতলা তৈরি করেছেন, আবার কেউ কেউ মৌসুমের উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকার হাওরের বীজতলার পানি নেমে গেছে। এ বছর আগেভাগে পানি নেমে গেছে। এই অবস্থায় আমাদের কৃষকদের কেউ কেউ আগাম বীজতলা তৈরি করেছেন, কেউ কেউ মৌসুমের উপযুক্ত সময়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা এই সমস্যার মধ্যে থাকলেও কৃষি বিভাগ এই বিষয়ে কোনো পরামর্শ দিচ্ছে না।’
জুনায়েদ আহমদ আরও বলেন, ‘এখন প্রতিনিয়ত হাওরের কৃষকেরা এমন নতুন নতুন সংকটের মুখে পড়ছেন।’
সুনামগঞ্জের হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সহসভাপতি শাহ কামাল বলেন, তিনি তাহিরপুরের দুর্গম হাওর এলাকায় কাজ করেন। সেখানে গিয়ে নিজেই বীজতলার পানি আগেভাগে নেমে যেতে দেখেছেন। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই প্রকৃতিতে এমন পরিবর্তন ঘটছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষকেরা উপযুক্ত পরামর্শ পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সুনামগঞ্জ কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫২১ হেক্টর জমিতে ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ জন্য বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৪৬৮ হেক্টর। তবে এখনো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘পানি কিছুটা আগে নেমেছে, এটা সত্য। তবে এতে বীজতলা তৈরি ও চাষাবাদে তেমন প্রভাব পড়বে না। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে কৃষকদের নানা বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, পানি আগেভাগে নেমে যাওয়ার কারণে বোরো আবাদে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হবে না বলে কৃষি বিভাগ মনে করছে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি 








