বোরো মৌসুম সামনে এলেই সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে বাড়তে থাকে উদ্বেগ। ধান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সেচের সংকট যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আকস্মিক বন্যায় পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। বছরের পর বছর এই দুই সমস্যার সঙ্গে লড়াই করলেও এর স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি।
কৃষকদের এই দুর্ভোগ কমাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জেলার তেরোটি নদী পুন:খননের জন্য প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। ২০২৪ সালে নেওয়া ওই প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সাল থেকে শুরু করে তিন বছরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের প্রস্তাবনা এখনো পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের টেবিলে পড়ে আছে। অনুমোদনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাঁড়া কিংবা নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি।
নদী ও হাওরের উচ্চতার পার্থক্য না থাকাই বড় সংকট
হাওরকন্যা সুনামগঞ্জের কৃষিতে বড় সমস্যা তৈরি করছে নদী ও হাওরের মধ্যে উচ্চতার পার্থক্য না থাকা। গ্রীষ্মে নদীর পানি হাওরে প্রবেশ করতে না পারায় সেচের সংকট দেখা দেয়। আবার বর্ষায় নদীর পানি সরাসরি হাওরে ঢুকে নিচু জমির ধান তলিয়ে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরেই নদী খননের দাবি জানিয়ে আসছেন সংশ্লিষ্টরা। নদীর নাব্যতা ও পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা গেলে একদিকে যেমন বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে সেচ ব্যবস্থাও সহজ হবে বলে মনে করছেন কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা।
‘নদীর পানি না কমায় সময়মতো চাষ করা যায় না’
দিরাইয়ের কৃষক জাকির মিয়া জানান, নদীর পানি দ্রুত নেমে না যাওয়ায় বোরো চাষের সময়সূচি ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে চারা রোপণ পর্যন্ত অনেক সময় চলে যায়। এর মধ্যে বৈশাখের শুরুতে বৃষ্টি হলে নিচু জমিতে পানি জমে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তার ভাষায়, নদীর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে কৃষকদের এই দুর্ভোগ থেকে বের হওয়া কঠিন।
জগন্নাথপুরের কৃষক আবুল হেলালও প্রতিবছর ফসল নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ধান চাষের জন্য প্রতি বছর ঋণ করতে হয়। কিন্তু ধান পাকার আগেই হঠাৎ জমিতে পানি ঢুকে পড়লে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যায়।
আবুল হেলালের ভাষায়, এতে একদিকে নিজের পুঁজি শেষ হয়ে যায়, অন্যদিকে ঋণের বোঝাও বাড়ে। একটি মৌসুমের ক্ষতি কাটিয়ে আগের অবস্থায় ফিরতে কয়েক বছর লেগে যায়।
প্রকল্প অনুমোদন না হলে ফের ক্ষতির আশঙ্কা
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রিয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, চলতি বোরো মৌসুমেও হাওরাঞ্চলের কৃষকদের একই সংকটের মুখোমুখি হওয়ার আশংকা রয়েছে। ডিসেম্বর মাস থেকে বীজ বপনের কাজ শুরু হবে। এর আগে নদী খনন প্রকল্পের অনুমোদন না হলে এবারও হাজার হাজার কৃষক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
অনুমোদন পেলে বদলাবে পানি ব্যবস্থাপনা
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, এক হাজার চারশত টাকার বেশি বাজেট বরাদ্দের এই প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে হাওর এলাকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এর ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে এবং সেচ সংকটও অনেকটা কমে আসবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী জানান, প্রকল্পের প্রাথমিক সব কাগজপত্র ইতিমধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে এর সুফল পাওয়া যাবে।
তবে তিনি বলেন, বাস্তবে এখনো মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। অন্যান্য প্রকল্পের অগ্রাধিকারের তালিকায় এটি পিছিয়ে রয়েছে।
ফলে আগামী বোরো মৌসুম ঘনিয়ে এলেও সুনামগঞ্জের কৃষকদের সেই পুরোনো শঙ্কা কাটছে না। নদী খনন প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন কবে শুরু হবে, সেটিই এখন হাওরাঞ্চলের কৃষকদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি 








