লাউয়াছড়ায় লজ্জাবতী বানর: ভুলভাবে অবমুক্ত করায় বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৩ PM

লাউয়াছড়ায় লজ্জাবতী বানর: ভুলভাবে অবমুক্ত করায় বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৬/০৯/২০২৬ ১০:১৪:১৮ AM

লাউয়াছড়ায় লজ্জাবতী বানর: ভুলভাবে অবমুক্ত করায় বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি


দিনের আলোয় দেখা মেলে না। রাত নামলেই গাছের ডালে নীরবে শুরু হয় চলাফেরা, খাবারের সন্ধান আর নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ। নিশাচর ও লাজুক স্বভাবের এই প্রাণীটির সঙ্গে তাই সাধারণ মানুষের পরিচয়ও খুব সীমিত। মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে টিকে থাকা বিরল এই প্রাণীটির নাম লজ্জাবতী বানর, ইংরেজিতে ‘বেঙ্গল স্লো লরিস’। আইইউসিএন, বাংলাদেশ-এর লালতালিকা অনুযায়ী প্রাণীটি ‘মহাবিপন্ন’ (ইএন)।

তবে উদ্ধার করা লজ্জাবতী বানর নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রটোকল অনুসরণ না করে লাউয়াছড়ায় অবমুক্ত করার কারণে তাদের টিকে থাকা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গবেষকদের দাবি, উপযুক্ত আবাসস্থল ও খাদ্যের নিশ্চয়তা ছাড়া হঠাৎ বনে ছেড়ে দেওয়ায় অনেক প্রাণী আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে এবং মৃত্যুর মুখে পড়ছে।

গবেষণার তথ্য বলছে, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাউয়াছড়ায় রেডিও কলার পরিয়ে অবমুক্ত করা হয়েছিল নয়টি লজ্জাবতী বানর। এর মধ্যে সাতটিই অল্প সময়ের মধ্যে মারা যায়। গবেষকদের মতে, উপযুক্ত আবাসস্থলের সংকট এবং নিজেদের এলাকা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বনে থাকা অন্য লজ্জাবতী বানরের সঙ্গে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ ছিল এসব মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

বন্যপ্রাণী গবেষক হাসান আল রাজীর সমন্বয়ে দেশি-বিদেশি গবেষকদের একটি অভিজ্ঞ দলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমানে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে প্রায় ২৩টি লজ্জাবতী বানর টিকে রয়েছে।

লজ্জাবতী বানরের জন্য সংকট শুধু বনে অবমুক্তকরণেই সীমাবদ্ধ নয়। বন উজাড়ের কারণে তাদের খাদ্যের উৎস ও আবাসস্থলও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। খাদ্যসংকটে অনেক প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে। এ সময় সড়ক ও রেলপথে কাটা পড়ে এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অনেক লজ্জাবতী বানরের মৃত্যু হচ্ছে।

ধীরগতির চলাফেরা ও বড় গোল মায়াবী চোখ এই প্রাণীটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ভয় পেলে মুখ ঢেকে ফেলার প্রবণতা থেকেই এর নাম হয়েছে ‘লজ্জাবতী বানর’। গবেষকদের মতে, প্রাণীটি বন্য এবং কিছুটা বিষাক্ত হওয়ায় একে কোনোভাবেই পোষা প্রাণী হিসেবে ঘরে রাখা উচিত নয়।

লাউয়াছড়ার পুরোনো গাছ কাটা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার ফলে এদের খাদ্যের উৎসও দিন দিন কমে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান মনে করেন, বৈজ্ঞানিক প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ না করে বন্যপ্রাণী অবমুক্ত করলে তাতে ইতিবাচক ফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

লজ্জাবতী বানর সংরক্ষণে অবশ্য কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে জার্মানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘প্লামপ্লরিস ইভি’ ও স্থানীয় বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন স্থান থেকে ২৩টি লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করে সেবা-শুশ্রূষা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টিকে ইতোমধ্যে বনে অবমুক্ত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাউয়াছড়া, সাতছড়ি ও রেমা-কালেঙ্গার নিবিড় চিরহরিৎ বনাঞ্চলে এই বিরল নিশাচর প্রাণীকে টিকিয়ে রাখতে হলে একসঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে বন ধ্বংস বন্ধ করা, শিকার বন্ধ করা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে বন্যপ্রাণী অবমুক্তকরণের সঠিক নীতিমালা কার্যকর করা

বন্যপ্রাণী গবেষক ও আইইউসিএন স্তন্যপায়ী দলের সদস্য তানভীর আহমেদ জানান, বিশ্বে প্রাইমেট বর্গের ৭৯ গোত্রের ৫০৪ প্রজাতির বানর রয়েছে। বাংলাদেশে ১০ প্রজাতির বানর ও হনুমান রয়েছে, যার মধ্যে ৬ প্রজাতি ‘বিপদগ্রস্ত’ তালিকায়। লরিসিডি পরিবারের লজ্জাবতী বানর ‘মহাসংকটাপন্ন’।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, লজ্জাবতী বানর নিশাচর ও লাজুক স্বভাবের। এদের দৈর্ঘ্য ২৬ থেকে ৩৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১ থেকে ২ কেজি। মাথা গোলাকার, মুখ চ্যাপ্টা এবং চোখ বড়। কান ও লেজ ছোট। শরীর ঘন ময়লাটে সাদা-বাদামি লোমে ঢাকা। মাথার ওপর থেকে গাঢ় রঙের একটি দাগ পিঠ বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে।

তানভীর আহমেদ বলেন, লজ্জাবতী বানর সাধারণত একাকী ও নীরবে থাকতে পছন্দ করে। দিনের পুরোটা সময় গাছের উঁচু কোটর অথবা পাতায় ঘেরা ঘন ডালের আড়ালে ঘুমিয়ে কাটায়। সন্ধ্যার পর একা কিংবা জোড়ায় খাবারের সন্ধানে বের হয়।

চিরসবুজ ও বৃষ্টিপাতপূর্ণ ঘন বন এবং বাঁশঝাড় এদের পছন্দের আবাসস্থল। শ্রীমঙ্গলের বনাঞ্চলেও এদের দেখা মেলে। পোকামাকড়, ছোট ফলমূল, গাছের নরম বাকল ও জিগার আঠালো খাবার এদের পছন্দ। পরাগায়ণেও প্রাণীটির ভূমিকা রয়েছে। এদের আয়ু বড়জোর ২০ বছর এবং বছরে একবার একটি বাচ্চা প্রসব করে।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে লজ্জাবতী বানরের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় আন্তর্জাতিক চোরাবাজারেও প্রাণীটির চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, চীন, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে লজ্জাবতী বানরের দেখা মেলে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর