প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পানি, পলি-বালু জমে কমছে গভীরতা, আর দখল ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। এর সঙ্গে বিল শুকিয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার ও নির্বিচারে মাছ শিকারের মতো নানা কারণে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি হাকালুকি হাওর তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে।
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এই হাওরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত জুড়ী, ফানাই, সুনাইসহ ১০টি নদী এবং অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া। এসব জলপথ দিয়ে বর্জ্য ও বালু এসে পড়ছে হাওরে। এতে একদিকে পানি দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে ক্রমেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে বিল ও জলাধার।
হাওর এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্য, লাখ লাখ মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হাকালুকি হাওরে কয়েক বছর ধরে পরিবেশগত পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহকারী মানুষের পাশাপাশি কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোও এর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নির্বিচারে সেচ দিয়ে মাছ ধরা, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং হাওরের জায়গা দখলের কারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
জানা গেছে, প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর আয়তনের হাকালুকি হাওরের মধ্যে বিলের আয়তন প্রায় ৪ হাজার ৪০০ হেক্টর। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, কুলাউড়া ও জুড়ী এবং সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলাজুড়ে হাওরটি বিস্তৃত।
জুড়ী, সুনাই ও পানাই নদীকে এই বিশাল হাওরের মূল প্রবাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে পলি ও বালু জমে প্রায় শতাধিক বিল ভরাট হয়ে গেছে। কাগজে-কলমে ২৩৮টি বিলের উল্লেখ থাকলেও প্রায় অর্ধেক বিলের অস্তিত্ব এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অবশিষ্ট বিলগুলোও ক্রমে ভরাট হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও যেসব বিলের নাব্যতা ৩০ থেকে ৩৫ ফুট ছিল, সেগুলোর গভীরতা এখন ১৫ থেকে ২০ ফুটে নেমে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত খনন করা না হলে আগামী এক দশকে অবশিষ্ট বিলগুলোরও বড় অংশ ভরাট হয়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া কাগজে হাওরের আয়তন ১৮ হাজার হেক্টর উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে কতটুকু হাওর টিকে আছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের অনেকে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে হাওরের জায়গা দখল করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
হাকালুকি হাওরের অন্যতম প্রবেশপথ জুড়ী নদীর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, নদীতে ভাসছে প্লাস্টিক, জুতা, পানি ও কোমল পানীয়ের বোতল, খাবারের প্যাকেটসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। জেলার জুড়ী নদীর পুরোনো ব্রিজ থেকে নতুন ব্রিজ হয়ে জায়ফরনগর ইউনিয়নের নয়াগ্রামের দিকে যতদূর যাওয়া যায়, নদীর বিভিন্ন স্থানে এসব বর্জ্যের স্তূপ দেখা যায়।
জুড়ী উপজেলা বাজারে বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নদীতে ফেলা এসব বর্জ্য কোনো বাধা ছাড়াই হাকালুকি হাওরে গিয়ে পড়ছে। একইভাবে হাওরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত অন্যান্য নদী ও ছড়ার মাধ্যমেও বর্জ্য প্রবেশ করছে।
এতে হাওরের পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি তলদেশে বর্জ্য জমে ভরাটের প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। হাওর ভরাট হয়ে গেলে অল্প বৃষ্টিতেও দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এর প্রভাব পড়ছে হাওরের জীববৈচিত্র্যের ওপরও।
জুড়ী উপজেলার হাওরপাড়ের বাসিন্দা রায়হান আহমেদ বলেন, হাওরে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। পানির নিচে হাত দিলেই প্লাস্টিক উঠে আসে। তাঁর ভাষ্য, হাওরের গভীরতাও অনেক কমে গেছে। আগে যে জায়গায় ১৫-২০ ফুট পর্যন্ত পানি থাকত, এখন সেখানে ৫-৭ ফুট পানি রয়েছে। পলি মাটি ও বালু জমে ধীরে ধীরে বিলগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, হাওর রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব ও হাওর কৃষি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নূর হোসেন মিঞা বলেন, কয়েকটি কারণে হাকালুকি হাওর তার বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। হাওরের ভেতরে অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণের কারণে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পানির স্রোতে আসা বালু জমে হাওরের তলদেশ ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে যাচ্ছে। ফলে পানি ধরে রাখার সক্ষমতাও কমছে।
তিনি বলেন, ব্যবহৃত প্লাস্টিক পণ্য হাওরের পানিতে ফেলে দেওয়ার কারণে বর্জ্য জমে হাওর ভরাট হচ্ছে। তাঁর মতে, হাওর সংরক্ষণে সরকারি বিভিন্ন অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে হাওর দূষণমুক্ত ও খনন করা জরুরি। তা না হলে হাওর ভরাট হয়ে যাবে। একসময় এখানে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও এখন অনেক প্রজাতি আর দেখা যায় না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নূর হোসেন মিঞা আরও বলেন, উজান থেকে আসা পানি বঙ্গোপসাগরে যাওয়ার পথে বড় বড় সেতুর পিলারের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে নদীতে বালু জমে চর সৃষ্টি হচ্ছে এবং নদীর পানি ধারণের ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে যেসব হাওরে মাছ, ফসল ও পানি থাকার কথা, সেসব জায়গার পরিমাণও কমছে। তাঁর মতে, পলিমাটির পরিবর্তে বালু জমে হাওর ভরাট হচ্ছে এবং হাওর রক্ষায় প্রয়োজনীয় সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এর প্রভাবে হাওরের গভীরতা ও জলজ উদ্ভিদ কমে যাচ্ছে এবং মানুষের তৈরি বর্জ্য ও পানি দূষণের কারণে মাছের পরিমাণও কমছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি সালেহ সোহেল বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির হাওরটি বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। তাঁর মতে, হাকালুকি হাওরের বিলগুলো জরুরি ভিত্তিতে খনন করতে হবে এবং দখল হয়ে যাওয়া জায়গা উদ্ধার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, হাওরের জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রবেশপথের ছড়া ও নদীগুলো খনন প্রয়োজন। বর্তমানে হাওরে প্রকৃতপক্ষে কতগুলো বিল রয়েছে, তার সঠিক হিসাবও করা দরকার।
পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলামও হাওর রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর মতে, সরকারি বিভিন্ন অধিদপ্তর হাওর সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। হাকালুকি হাওরের পরিবেশ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে হাওরকে দখল ও দূষণমুক্ত করার পাশাপাশি দ্রুত খনন করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষ্য, একসময় হাওরে বহু প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও এখন তা আর পাওয়া যায় না।
মৌলভীবাজারের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আরিফ হোসেন বলেন, কাগজে-কলমে হাকালুকি হাওরে ২৩৮টি বিল রয়েছে। তবে বাস্তবে প্রায় শতাধিক বিল ভরাট হয়ে গেছে। হাওরের ৬০ শতাংশ বিল ইজারা দেওয়া হলেও ভরাট হয়ে যাওয়ায় বাকি বিলগুলো ইজারা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, নথিতে ২৩৮টি বিলের উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সবগুলোর অস্তিত্ব নেই। প্রায় অর্ধেক বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় হাওরে পানি ধরে রাখার সক্ষমতা কমেছে। গত বছর হাওরে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া গিয়েছিল, এ বছরও সেই পরিমাণ পাওয়া যাবে না বলে তিনি মনে করেন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, একসময় হাকালুকি হাওরে দেশীয় মাছের ২৬০টি প্রজাতি ছিল। ২০১৫ সালের একটি জরিপে ১৪৩ প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যায়। আগামী জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে বর্তমানে হাওরে কত প্রজাতির মাছ রয়েছে, সে বিষয়ে জানা যাবে বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, হাওরের বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে বিলগুলো খনন করা প্রয়োজন।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, হাকালুকি হাওরে বর্জ্য যাওয়ার বিষয়টি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেখা হয়। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভাকেও এ বিষয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাঁদের অবহিত করা হলে পরিবেশ অধিদপ্তর সেখানে যাবে। তবে জনবল সংকটের কারণে ইচ্ছা থাকলেও সব জায়গায় নিয়মিত যাওয়া সম্ভব হয় না বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, হাওরের সমস্যা সম্পর্কে তাঁর কিছু জানা নেই। হাওর উন্নয়ন প্রকল্প হবে কি না, সেটি তাঁর বিষয় নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সি.এম ইউসুফ হোসাইন বলেন, হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে সেটি এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে হাওরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বেশ কিছু উন্নয়ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
হাওরপাড়ের বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উঠে আসছে—দূষণ, পলি-বালু জমা, দখল, অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ এবং মাছের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো একাধিক সমস্যার মুখে পড়েছে হাকালুকি। অবশিষ্ট বিলগুলো সংরক্ষণ ও খনন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং হাওরের সঙ্গে সংযুক্ত নদী-ছড়াগুলো সচল রাখা না গেলে জলাভূমিটির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি 








