বানিয়াচংয়ে ৯ ছাত্র-জনতা হত্যা: দুই বছরেও আদালতে যায়নি চার্জশিট
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৫ PM

বানিয়াচংয়ে ৯ ছাত্র-জনতা হত্যা: দুই বছরেও আদালতে যায়নি চার্জশিট

বানিয়াচং (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৮/০৯/২০২৬ ০৫:৩৫:৪৯ PM

বানিয়াচংয়ে ৯ ছাত্র-জনতা হত্যা: দুই বছরেও আদালতে যায়নি চার্জশিট


হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনের সময় নিহত নয়জন ছাত্র-জনতার হত্যা মামলার তদন্ত দুই বছরেও শেষ হয়নি। এখনো আদালতে জমা পড়েনি মামলার চার্জশিট। এতে শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিচার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তার ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্ট বানিয়াচংয়ের এলআর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জড়ো হন ছাত্র-জনতা। সেদিন দুপুরে বড়বাজারের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলার অভিযোগ ওঠে।

পরদিন ৫ আগস্ট কারফিউ উপেক্ষা করে সকাল থেকেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নামেন। বড়বাজার শহীদ মিনারে গণমিছিল পৌঁছানোর পর মিছিলের একটি অংশ থানার দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ওইদিন সাতজন নিহত হন এবং পরে হাসপাতালে মারা যান আরও দুজন। ৫ আগস্টের সংঘর্ষে বানিয়াচংয়ে ছয়জন নিহত হওয়ার খবরও সেদিন প্রকাশিত হয়েছিল।

নিহতদের মধ্যে ছিলেন ভাঙ্গারপাড়ের হোসাইন মিয়া, জাতুকর্ণপাড়ার আশরাফুল ইসলাম, তোফাজ্জল হোসেন, পাড়াগাঁওয়ের মোজাক্কির মিয়া, পূবগড়ের সাদিকুর রহমান, কামালখানীর শেখ নয়ন হোসেন, সাগরদিঘীর পূর্বপাড়ের সোহেল আখঞ্জী, চানপুরের আকিনুর রহমান ও খন্দকার মহল্লার আনাস মিয়া। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট দায়ের হওয়া মামলার নথিতে নিহতদের একজনকে ১২ বছরের হাসান মিয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

হত্যাকাণ্ডের পর বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা বানিয়াচং থানা ঘেরাও করেন। ওই সময় থানায় কর্মরত পুলিশের এসআই সন্তোষ চৌধুরী গণপিটুনিতে নিহত হন। পরে নয় ছাত্র-জনতার পরিবারের পক্ষ থেকে নয়জনের হত্যার ঘটনায় মামলা, এসআই সন্তোষ চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি এবং আহতদের পক্ষ থেকে আরও চারটি মামলা করা হয়। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ২২ আগস্ট শহীদ হোসাইন মিয়ার বাবা ছানু মিয়া বাদী হয়ে ১৬০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলায় জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক এমপি ময়েজ উদ্দিন শরীফ রুয়েলকে প্রধান আসামি করা হয়। মামলাটিতে আরও ২৫০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এ পর্যন্ত ছয়বার পরিবর্তন হয়েছেন। বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা বানিয়াচং থানার ওসি (তদন্ত) কবির হোসেন জানান, তিনি ছয় মাস আগে থানায় যোগ দিয়েছেন। তার ভাষ্য, এ মামলায় এখন পর্যন্ত ৩০ থেকে ৩৫ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।

তবে শহীদ পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মামলার কয়েকজন আসামি প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। তদন্তের ধীরগতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।

মামলার বাদী ও শহীদ হোসাইন মিয়ার বাবা ছানু মিয়া বলেন, মামলার অগ্রগতি জানতে চাইলে পুলিশ তাকে কিছু জানায় না। সন্তান হত্যার বিচার পাওয়া নিয়েও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।

শহীদ সাংবাদিক সুহেল আকঞ্জির স্ত্রী মৌসুমী আক্তার বলেন, মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি জানেন না। তবে এখনো চার্জশিট দেওয়া হয়নি বলে শুনেছেন। স্বামী হত্যার বিচার কবে পাবেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেন তিনি।

শহীদ তোফাজ্জল হোসেনের বাবা আব্দুর রউফ মিয়াও মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানান।

বানিয়াচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ নাজমুল হক বলেন, ‘নাইন মার্ডার’সহ থানায় ছয়টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত পুলিশি প্রতিবেদন আদালতে পাঠানো হবে।

হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ বলেন, জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলাগুলো ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। বানিয়াচংয়ের নয় হত্যা মামলাটিও সেখানে যেতে পারে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে।

এদিকে দেশজুড়ে জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মামলায় বিভিন্ন জেলায় চার্জশিট দেওয়া হলেও বানিয়াচংয়ের এই হত্যা মামলায় এখনো তা হয়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ১০৬টি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ৩১টি ছিল হত্যা মামলা।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর