দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে দেশের চা বাগানগুলোর লক্ষাধিক শ্রমিকের। নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন আটকে থাকা বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন অবশেষে আগামী ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর চা বাগানগুলোতে নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার প্রস্তুতির পাশাপাশি ফিরে এসেছে নির্বাচনী আমেজ।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (রেজি. নং-বি-৭৭) নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিলতায় আটকে ছিল। এতে সংগঠনটির কার্যক্রমেও একধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৪ জুন দেশের চা শ্রমিকদের এই একমাত্র ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও উচ্চ আদালতে মামলা ও অন্যান্য জটিলতার কারণে ২০২১ ও ২০২৪ সালে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়নি।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ চা শ্রমিকরা শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার আবেদন-নিবেদন করেন। এর ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুছ সামাদ আল আজাদকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে ১১ সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়।
নির্বাচন কমিশন গঠনের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলার চা বাগানগুলোতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ, ভ্যালি কার্যকরী পরিষদ এবং পঞ্চায়েত কমিটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাদের আনাগোনায় চা বাগানগুলোতে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
এরই মধ্যে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শ্রম অধিদপ্তরের অধীন গঠিত ‘বাচাশ্রইথ নির্বাচন কমিশন, ২০২৬’-এর পক্ষ থেকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুছ সামাদ আল আজাদ স্বাক্ষরিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৮ নভেম্বর শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে।
তফসিল অনুসারে, দেশের পাঁচ জেলার ২০টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা যাবে ৫ ও ৬ নভেম্বর। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫, ৬ ও ৯ নভেম্বর। এসব দিনেও সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে।
১০ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা এবং ১১ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। ১১ নভেম্বর বিকেল ৫টার মধ্যে প্যানেলভিত্তিক খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। বাতিল হওয়া মনোনয়নপত্রের বিষয়ে আপিল ও শুনানি অনুষ্ঠিত হবে ১২ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৩ নভেম্বর বিকেল ৩টা।
১৪ নভেম্বর সকাল ১১টায় প্যানেলভিত্তিক চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। একই দিন দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা এবং ১৫ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্যানেলভিত্তিক প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে।
নির্ধারিত দিনে দেশের প্রতিটি চা বাগানের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৫ সদস্যের পঞ্চায়েত কমিটি, সাতটি ভ্যালি কার্যকরী পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সভাপতি ও সম্পাদকমণ্ডলীর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সাতটি ভ্যালি হলো লস্করপুর, বালিশিরা, মনু-ধলাই, লংলা, জুড়ী, সিলেট ও চট্টগ্রাম।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ আট বছর পর অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচনে সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রার্থী এবং প্রায় ৬০০ প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশের ২৩১টি চা বাগানের লক্ষাধিক নারী ও পুরুষ শ্রমিক নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
নির্বাচন কমিশনের সদস্য ও বিভাগীয় শ্রম দপ্তর, শ্রীমঙ্গলের উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন জানান, শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী ২৮ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে।
২০১৮ সালের ২৪ জুন অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন মাখন লাল কর্মকার এবং সাধারণ সম্পাদক হন রামভজন কৈরী। পরে অসুস্থতাজনিত কারণে নির্বাচিত সভাপতি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করতে না পারায় সহসভাপতি পংকজ কন্দ অলিখিতভাবে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
অন্যদিকে, সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর চা শ্রমিক ইউনিয়নের দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এরপর থেকে সহসাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি দীর্ঘদিন রোগভোগের পর মারা যান সংগঠনের সভাপতি মাখন লাল কর্মকার।
আসন্ন নির্বাচনে কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি পদে রামভজন কৈরী, রাজু গোয়ালা ও পংকজ কন্দের নাম আলোচনায় রয়েছে। সাধারণ সম্পাদক পদে নিপেন পাল ও পরেশ কালিন্দির নেতৃত্বাধীন প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে।
তফসিল ঘোষণার পর ভ্যালি ও পঞ্চায়েত পর্যায়ের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি পদপ্রার্থী বিজয় বুনারজি বলেন, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় ইউনিয়নের সাংগঠনিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কমিটির কার্যক্রমেও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, শ্রমিকরা এখন এমন নেতৃত্ব বেছে নিতে চান, যারা শুধু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাখবেন না; বরং তাদের উচ্চ মজুরি ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি, যথাসময়ে বেতন প্রদান, চা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য উন্নত শিক্ষার সুযোগ এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ২০১৮ সালে নির্বাচিত কমিটি টানা আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছে। ২০২১ ও ২০২৪ সালে নির্ধারিত নির্বাচন নানা জটিলতায় অনুষ্ঠিত না হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ পাননি শ্রমিকরা। ফলে ২৮ নভেম্বরের নির্বাচন শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের আয়োজন নয়, চা শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও প্রত্যাশার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস









